
বৈবাহিক
আমাদের অফিসের চিফ ক্যাশিয়ার বিজনবাবু সবশুদ্ধ তিনটে বিয়ে করেছিলেন। অবশ্যই একসাথে নয়। একজন করে স্ত্রী বিয়োগ আর তার কিছুদিন পরই আর একজন স্ত্রী-যোগ। এইভাবেই যোগবিয়োগ করে করে মোটামুটি গোটা জীবনটাই চালিয়ে গেছেন। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতেন সদ্য মা-হারা শিশুদের দেখাশোনার জন্য বাধ্য হয়ে তাদের আর একজন মা এনেছেন। আমার সঙ্গে যখন আলাপ হয়েছিল তখন তিনি সন্তানদের জন্য তিন নম্বর মায়ের বন্দোবস্ত সবে করেছেন। বলা বাহুল্য বিজনবাবুর দুই নম্বর চলে যাবার সময় তাঁর সন্তানরা কেউই আর শিশু ছিলোনা অবশ্য।
অফিস থেকে এবার আমাদের পাড়ায়। এ ঘটনা প্রায় সত্তর আশি বছর আগের। এই পাড়ায় একজন খুব রসিক মানুষ থাকতেন। সঙ্গত কারণেই তার নাম পরিবর্তন করে আপাতত তার নাম ধীরেনবাবু রাখলাম।
আমরা খুব ছোটবেলায় দেখেছি রাস্তাঘাটে পরিচিত বা অর্ধপরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হলেই দীর্ঘ সময়ধরে উনি গল্প জুড়ে দিতেন। আমাদের অর্থাৎ ছোটদের সঙ্গে দেখা হলে মজার মজার কথার খই ফুটতো মুখে। এহেন রসেবশে থাকা মানুষটির জীবনের রসালো একটি ঘটনা বেশ কিছুদিন ধরে পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে এবং রকে রকে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার খোরাক হয়ে গিয়েছিলো। চল্লিশের দশকের শেষের দিকের এমন একটি সংবাদ এখনকার ভাষায় যাকে বলে ভাইরাল। ঘটনাটি সংক্ষেপে এইরকম:
ধীরেনবাবুর তিন ছেলে,বড়ো ছেলের বিয়ের কথা বেশ কিছুদিন ধরে চলছিলো। অনেক পাত্রী দেখা হয়েছিলো বটে কিন্তু কাউকেই পছন্দ হয়নি। সেই আমলে যখন চল্লিশের দশক শুরু হয়েছে, পরিবারের আবহাওয়ায় ছেলের পছন্দ বা মতামতকে তেমন প্রাধান্য দেওয়ার রেওয়াজ ছিলোনা। যাইহোক, এইভাবেই কিছুদিন যাবার পর একটি মেয়ের নাম বারবার আলোচনার বৃত্তে ভেসে বেড়াচ্ছিলো। তাদের বাড়ি বেশ কিছুটা দূরে, এখান থেকে ট্রেনে ঘন্টাখানেক। শেষপর্যন্ত ঠিক হলো প্রথমেই সবাই একসাথে যাবার দরকার নেই, আপাতত ধীরেনবাবু একাই যাবেন এবং মেয়ে পছন্দ হলে একেবারে পাকা কথা দিয়ে আসবেন। তারপর কন্যাপক্ষ তাঁদের বাড়িতে এসে বাকি কথাবার্তা এবং বিয়ের দিনক্ষণ ফাইনাল করবে।এই পর্যন্ত ঠিকঠাকই ছিলো। কিন্তু মেয়েটিকে দেখার পর একটা অঘটন। পুত্রের জন্য চিহ্নিত রূপসী কন্যাকে দেখে পঞ্চাশোর্ধ ধীরেনবাবুর কুঞ্জবনে সম্পূর্ণ বিনানোটিসে হঠাৎ আবার একবার বাঁশি বেজে উঠলো। সুন্দরী মেয়েটিকে এতো বেশি ভালো লেগে গেলো যে ধীরেনবাবু নিজেই তাকে বিয়ে করে ফেললেন এবং সোজা বাড়িতে নিয়ে চলে এলেন। প্রচন্ড হৈচৈ, চেঁচামেচির সঙ্গে প্রচুর চোখের জল, হাহুতাশ ইত্যাদি বিশেষ পাত্তা পেলনা।।হুলুস্থুল বেধে যাওয়া বাড়ির পরিবেশ শান্ত হতে অনেকদিন লেগেছিলো। এই ‘হতে পারতো পুত্রবধূ’ মহিলাকে পরে কয়েকবার দেখেছি। মনে হয়েছিল যথেষ্ট সুন্দরী বটে।
এইবার যে ঘটনার কথা লিখছি সেটা আমাদের পাড়ার কাছাকাছি। খুবই উচ্চশিক্ষিত এক ভদ্রলোক। লেখাপড়ার নেশার পাশাপাশি বিয়ে করার নেশাও বোধহয় ছিলো। অনায়াসেই গোটা দুয়েক বিয়ে করে একসাথেই দুই বৌকে নিয়ে দিব্যি সংসার করে যাচ্ছিলেন। তখন হিন্দু কোড বিল নামে কিছু ছিলনা।কিন্তু গন্ডগোল হয়ে গেলো তার বেশ অনেকগুলি বছর পরে আবার যখন কোনো এক মাতাল সমীরণে বসন্তের হাওয়া লাগলো তাঁর গায়ে। তাই মনটা আর রইলোনা ঘরের কোনে।
ধীরেনবাবুর ঘটনার আরো বছরদশেক আগে ঐ একই প্রজাপতি ঋষির ইশারায় এই ভদ্রলোক ছোটছেলের জন্য চিহ্নিত কন্যার পঞ্চশরে দগ্ধ হয়ে হঠাৎ নিজেই তাকে বিয়ে করে ফেললেন। শুনেছিলাম তাঁর বড়ো ছেলের মেয়ে, যে তখন যথেষ্ট সাবালিকা, হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো নতুন বরবৌকে বাড়িতে ঢুকতে দেবেনা বলে। তবে শেষপর্যন্ত একেবারে মিটমাট না হলেও একটা শর্তসাপেক্ষে সন্ধিপ্রস্তাব মেনে নিয়েছিলো যুযুধান দুপক্ষ।

এগুলো সবই বিয়ে নিয়ে অশান্তি আর খানিকটা সহিংস প্রতিরোধের কথা। এবার দুটো অহিংস শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঘটনা। একটা চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি, তাই তার অনেকটাই আমার শোনা। অন্যটি কিন্তু আমার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া।
আমাদের শহরে মোহিনীবাবু ( নাম পরিবর্তিত) নামে একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল ছিলেন। শুনেছিলাম এই পেশায় তাঁর বিশাল নামডাক ছিল এবং অঢেল টাকাপয়সা কামিয়েছিলেন। মোহিনীবাবু ব্যবহারে অমায়িক ও ব্যক্তিগত জীবনে মাত্রাতিরিক্ত স্বচ্ছ, সৎ ও সাহসী ছিলেন। নিজের বিবাহিতা স্ত্রী বাড়ীতে থাকতেন। এছাড়াও বাইরে তাঁর তিনজন রক্ষিতা ছিলেন। মাঝেমাঝে যখন তিনি নিজের গাড়ি নিয়ে বাজারে যেতেন তখন মাছ, মাংস ও আনাজ ভরা একই মাপের চারটে বড়োবড়ো ব্যাগ নিয়ে ফেরার পথে নিজের বাড়ির জন্য এক সেট ও বাকি তিন সেট তিনজন রক্ষিতার বাড়িতে বাড়িতে ড্রাইভারের হাত দিয়ে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করতেন। বাড়ির যেকোনও অনুষ্ঠানে তিনজনেই খুব সাজগোজ করে আসতেন এবং সকলের কাছেই এমনকি স্বয়ং মোহিনীবাবুর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের কাছেও যথেষ্ট সম্মান-টম্মান পেতেন শুনেছিলাম। মোহিনীবাবুর জীবনে কোন উথালপাথাল নাটকীয়তা ছিলোনা হয়তো কিন্তু সবশুদ্ধ চারজন নারীপরিবৃত জীবনের ছন্দে কোনো অশান্তি বা বিশৃঙ্খলার কোনো খবর ছিলোনা অবশ্যই।
এবারের ঘটনা আমার নিজের চোখে দেখা। এই ভদ্রলোকের আসল বাড়ি কোথায় ছিলো কেউ জানতোনা। আমাদের বাড়ির কাছেই জমি কিনে নতুন তৈরি করা বাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকতে শুরু করেন। তাঁর বাড়ি এতটাই কাছে যে নীরজ চোপড়া ঠিকঠাক ছুঁড়তে পারলে সেই জ্যাভলিন আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে সরাসরি সেই মানুষটির বাড়ির ছাদে পৌঁছে যাবে। এখানে নায়ক একজন কালীসাধক। বাড়িতে একটি আলাদা ঘরে নৃমুন্ডমালিনী কালীমূর্তি। প্রতিদিন ভোরে উঠে হেঁটে চলে যেতেন গঙ্গার ধারে। অনেকক্ষণ ধরে গঙ্গাস্নান চলতো। তারপর বাড়ি ফিরে এসে পুজোয় বসতেন। পুজোটুজো সেরে খাওয়াদাওয়া করে সারাদিনের জন্য বেরিয়ে যেতেন নিজের ব্যবসার কাজে। ফিরতেন সন্ধ্যায়। একই বাড়িতে কালীসাধক ভদ্রলোক তিন বৌ নিয়ে দিব্যি সংসার করতেন। এই তিন বৌ আবার ব্যক্তিগত সম্পর্কে তিনবোন। হ্যাঁ, ঠিকই বলছি, তিন সহোদরা বোনের একজন স্বামী। মোটামুটি মহাভারতের দ্রৌপদির ঠিক উল্টো ব্যাপার। সেখানে একজন নারীর পাঁচজন স্বামী আর এখানে একজন স্বামীর তিনজন নারী। সেই বাড়িতে কিন্তু সবসময় শান্তি বিরাজ করতো। ভদ্রলোক বেরিয়ে যাবার পর তিন বোন সেজেগুজে মাঝেমাঝে একসাথে কিছু কেনাকাটা অথবা সিনেমার ম্যাটিনি শো দেখতে যেতেন। সবসময়ই একসাথে গল্প করতে করতে। এই পরিবার বাইরে কারো সাথেই মেলামেশা করতোনা, নিজেদের ছন্দে থাকতেন।কাছাকাছি লোকেরা অবাক হয়ে এমন peaceful coexistence দেখে অবাক হয়ে যেতো।
বছরখানেক পরে ভদ্রলোক খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। শুনেছিলাম তিন বৌ তাঁর সেবার করতো পালা করে রাত জেগে। কিন্তু তিনি বাঁচলেন না। পরে বাড়াবাড়ি হলে কলকাতায় একটা নার্সিংহোম ও কয়েকদিন পরে এখানে
খবর এলো যে ভদ্রলোক মারা গিয়েছেন।
ভদ্রলোক মারা যাবার মাসখানেক পরে তাদের কোনো একজন আত্মীয় এখানে এসে কিছুদিন থেকে বাড়িটা বিক্রি করে চলে যান। ভদ্রলোক মারা যাবার পর কলকাতার কোনো শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে শুনেছিলাম কিন্তু তারপর থেকে ঐ তিনবোন অর্থাৎ তিন স্ত্রীকে আর কেউ কোনোদিন দেখতে পায়নি।
না, তারা সহমরণে গিয়েছিল বলে কোনো খবর পাওয়া যায়নি অবশ্য।


খুবই মনোগ্রাহী রচনা। বহুবিবাহের সরস সামাজিক চিত্র।
লেখাটি বেশ মনোগ্রাহী। মন দিয়ে পড়লাম।
অসাধারণ কাকু । 🙏