আশ্চর্য এই পৃথিবী। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এখানে সুখে থাকার জন্য, দুঃখ শোক এড়িয়ে ভাল থাকার জন্য কত না চেষ্টা করে মানুষ।
কিন্তু দুঃখের রাতে, গভীর আঘাতের দিনে ঠিক কী যে করবে ভেবে পায়না।
গভীরতম সংকটের অভিঘাতে বহু মানুষকে অসংলগ্ন হতে দেখেছি।
কখনও মনে হয়েছে, এই উন্মাদ দশাই বুঝি তাঁদের জীবনটাকে রক্ষা করল। তবে
সত্যিই কি এমন হতে পারে?

চিকিৎসক জীবনের এমন কিছু কিছু ঘটনা আজও মনে থেকে গেছে।

রাত ডিউটি চলছে,সাপে কাটা এক কিশোরী ভর্তি হ’ল। হাসপাতালে যতটুকু চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব তার কিছুতেই সাড়া দিলে না সে। রাত দুটো নাগাদ স্টাফ নার্স এসে বললেন বাড়ির লোককে খারাপ খবরটা আমাকেই জানাতে হবে। গিয়ে দেখি মেয়ের মাথাটা কোলে নিয়ে মা টানটান হয়ে বসে আছেন। চোখের দৃষ্টি স্থির, পাথরের মূর্তি যেন। বেডের পাশে
মিনিট খানেক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমার উপস্থিতি টের পেয়েও চোখ না ফিরিয়েই ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন,
–এখনও সব ইঞ্জেকশন দেওয়া হ’লনা ডাক্তারবাবু?
ও কখন খুলবে চোখ!

শান্ত স্বরে বললাম সবটা।
কয়েক মুহূর্তের নীরবতা, চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জলের বিন্দু নেমে এলো।
কেন জানিনা আমার মনে হ’ল, আমি বলার আগেই সবটা বুঝেছিলেন তিনি।

আরও একটা ঘটনার কথা বলি। সেসময় মুর্শিদাবাদের কাছে একটা বড়সর লঞ্চ ডুবির ঘটনা ঘটেছিল।
সে ঘটনার দিন দশেকের মধ্যেই বাহ্যিক জ্ঞান লুপ্ত এক মহিলাকে কলকাতার মানসিক রোগের হাসপাতালে ভর্তি করা হল।
সেসময় এ ধরনের রোগীদের জন্য প্রচলিত সবরকম চিকিৎসার পরেও তেমন না কমায় স্যার বললেন, হিস্ট্রি টা কদ্দূর জানো?
বাড়ির লোক তেমন কেউ না থাকায় সম্পূর্ণ ইতিহাস জানতাম না, যতটুকু জানা ছিল লঞ্চডুবিতে সন্তান হারিয়েই এমন অবস্থা ওনার , তাই-ই বললাম স্যারকে।

–এ অবস্থায় হিস্ট্রি উদ্ধার করা সহজ নয়, তবু‌ চেষ্টা করো!

পরের দু তিনটে দিন ওয়ার্ডের বাকি পেসেন্ট অন্যদের দেখতে বলে নিজে পড়ে রইলাম ওই মানুষটাকে নিয়ে।অসংলগ্ন, কখনও ভয়ার্ত, কখনও বা এলোমেলো সব কথাবার্তার মধ্যেই যতটুকু উদ্ধার করলাম, তাতে জানা গেল একজন না, দু দুটো সন্তান দু’হাতে জাপটে ধরে জলে ভাসছিল অবন্তী। একজন তিন, আরেকজন দু’বছর বয়সী। হঠাৎই বড় একটা ঢেউ আসায় ডান হাতে ধরা বাচ্চাটা ভেসে যায়, আর তাকে আঁকড়ে ধরতে গিয়েই দ্বিতীয় জনও।
তারপর আর কিছু জানেনা অবন্তী।
পরদিন রাউন্ডের সময় স্যার কে বললাম সবটা।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে স্যার বললেন, কিছুদিন সময় দাও না ওকে, সবকিছুর কি ওষুধ হয়?
মাসখানেক পর অবন্তীকে বহরমপুরের হাসপাতালে পাঠানো হ’ল– তখনও সে একইরকম অসংলগ্ন।

জীবন এমনই অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। সদর্থক নঙর্থক দুইই থাকে জীবনে,কার ভাগে কতটা পড়বে তার নিশ্চয়তা না থাকলেও কিভাবে সেই ঘটনাগুলোর ধাক্কা সামলাচ্ছি আমরা তার উপরেই নির্ভর করে কোন্ খাতে বইবে জীবন।
ব্যাঙ্কের চাকুরে অনলবাবুর একমাত্র ছেলে রোহিত।
হায়দ্রাবাদের কলেজে পড়তে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ওকে নিয়ে তেমন দূর্ভাবনা করতে না হলেও বছর দুয়েকের মধ্যেই ফিরিয়ে আনতে হলো বাড়িতে। সবরকম নেশার চক্করে পড়ে গেছিল রোহিত।
কলকাতায় ফেরার পর ওকে দেখছিলাম আমিই।
কয়েক মাস কাটার পর অনলবাবুই একদিন এসে বললেন,
ছেলেটাকে তো আপনিই ফেরালেন ডাক্তারবাবু,ভাবছি আবার পড়াশোনাটা শুরু হোক! একটা প্রাইভেট কলেজে কথা বলেছি, মনে হয় হয়ে যাবে!
কলেজের অবস্থানটা শুনে ভাল লাগল না, বললাম, একটু খেয়াল রাখবেন ওর ওপর…এখন ও নেশা করছে না ঠিকই, তবুও…
আশঙ্কাটা সত্যি না হলেই ভাল হ’ত, তবে লুকিয়ে চুরিয়ে আবার একই অবস্থায় পৌঁছে গেল রোহিত।
ওর বাবা অবশ্য আমায় বারবারই বলতেন, না ডাক্তারবাবু, ছেলের কিন্তু এবার মন বসেছে! কলেজে খুব চাপ, এখন আর সঙ্গে যেতেও হচ্ছেনা!
তারপর সেই দিনটাও এসে পড়ল। বিকেলের দিকেই এলো ফোনটা, হাহাকারের মতো শোনাচ্ছিল অনলবাবুর গলাটা—
ডাক্তারবাবু, রোহিত আর নেই! কলেজ থেকে ফিরছিল দুপুরে–সানস্ট্রোকে মারা গেছে বলছে ওরা! এরকম হতে পারে স্যার?
ওকে কি মেরে ফেলল?
একটা ট্যাক্সির মধ্যে আধশোওয়া হয়ে পড়েছিল..ওকে কি খাইয়ে দিল কিছু? এই বয়সের একটা ছেলে কি এভাবে মারা যেতে পারে?
থানা পুলিশ কলেজের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সব্বার সঙ্গে কথা বলেছি, কেউই ঠিক…!
কান্নায় ভেঙে পড়েন অসহায় বাবা।ফোনের অপরপ্রান্তে আমি তখন হতবাক।
এর পরের ক’দিন হতাশার, যন্ত্রণার। পোস্টমর্টেম রিপোর্টের পরেও চলল এরকম।
তারপর একদিন আবার ফোন এলো–
এখন অনেকটাই বুঝতে পারছি ডাক্তার সাহেব!
ছেলেটা আসা থেকেই নেশার চক্করে পড়েছিল, ওষুধ টষুধ কিচ্ছু খেত না স্যার!
ওর হাতে তো টাকাপয়সা দিতাম না বিশেষ…টাকার জন্য চাপ দিত ওকে! শেষে একদিন….পেডলার রা নাকি এরকম করেই, পুলিশের লোকের থেকেই জানলাম! ভেজাল ব্রাউন সুগার দিতে দিতে হঠাৎ একদিন আসল জিনিসটা দিয়ে দিলে অনেকেই আর সহ্য করতে পারেনা! এসবের কিছুই জানতাম না আমি, কি করে জানব বলুন তো? আমার ছেলেটা তো গেল, ওকে তো আর ফেরত পাব না , কিছুই কি করা যায়না এটা নিয়ে?

করেছিলেন তিনি।
অভিভাবকদের নিয়েই একটা দল তৈরী করলেন, তাঁদের সকলেই এমনই ভুক্তভোগী মানুষ। কারও সন্তান নেশাগ্রস্ত, কারও ছেলে অথবা মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।
অনলবাবুর মতে নেশাও তো একরকম আত্মহত্যাই!
স্কুলে গিয়ে,ক্লাবে গিয়ে ওনারা বলছেন, আমি পারিনি, সময়ে বুঝিনি, আপনারা বুঝুন প্লিজ!
যদ্দুর জানি, আজও এ কাজটা করে চলেছেন তিনি এবং তাঁরা।

এই হ’ল জীবন।
পটচারা-র কথা মনে পড়ছে। বিনয় পিটকের পটচারা,সংসারের স্বপ্ন, স্বামী সন্তান,সব হারিয়ে উন্মাদ হয়েছিল সে। পথে পথে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াত অপ্রকৃতিস্থ মেয়েটা। যেখানেই যেত নগরের লোকে পাথর ছুঁড়ে, লাঠিসোঁটা নিয়ে তাড়িয়ে দিত তাকে। এভাবেই একদিন বুদ্ধের কাছাকাছি আসা, ভয়ার্ত পটচারা-র সম্বিৎ ফিরে আসা আর তারপর এক অনন্ত যাত্রা!
প্রাচীরের গায়ের গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই এক আশ্চর্য উপলব্ধি হ’ল একদিন। সে দেখলে পাশাপাশি ফোঁটা গুলোর মধ্যে
সব ফোঁটা সমদূরত্বে না গিয়ে কোনোটা আগেই থেমে যাচ্ছে, আবার কোনোটা পরে। মানুষের জীবনের সঙ্গে এর মিল পেল পটচারা।
শাক্যমুনির বাণী উত্তরোত্তর শান্ত করল তাকে, জীবন যেমনই দিয়েছে তেমনটাই গ্রহণের শক্তি তৈরী হল ধীরে ধীরে।

শোক তাপ জীবনেরই অংশ। যে আগুনে লোহা গলে যায়, সেই একই আগুনে ভঙ্গুর ডিম হয়ে ওঠে কঠিন!
কিভাবে নিচ্ছি, কতদিন ধরে নিচ্ছি, সেটাই আসল।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]