জীবনের অর্ধেকটাই লোকের কথা শুনতে আর বুঝতেই কেটে গেল। শুনতে শুনতে এমন বদভ্যাস হয়েছে যে লোকজন দু’চারটে কথা বললেই মনে হয় এর পরের কথাটা ঠিক কি হতে পারে,সেটা আমি জানি। সত্যিই কি জানি তা?
একটা মানুষ যখন কথা বলে, সে কি শুধু মুখেই বলে? কথাটা কোথা থেকে কোথায় এলো, কিভাবেই বা এলো, কতটুকুই বা সে বলতে পারল , সেটাও তো ভাবতে হয়! তাই নিজেকে সবজান্তা ভাবলেই গড়বড়– সব কেন, কোনও কিছুই জ্যান্ত হয়ে ধরা দেয়না তখন– কেঁচে গন্ডুষ করতে থাকি।

হরেক মানুষ আর তাদের হাজার মন। কী তার বাহার।
আজ সকালেই মাস্টারমশাই হাজির। বছর পঞ্চাশ বয়েস, একসময় নাটকের দল করতেন। স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক তিনি। মনমেজাজের ওঠানামা লেগেই থাকে তাঁর– যখন অবসাদে থাকেন, তখন সপ্তাহের পর সপ্তাহ স্কুলে যাওয়া বন্ধ। আবার মাঝেমধ্যেই চমৎকার মুডে ফেরেন তিনি। সে সময়টা তাঁর সুসময়, অতএব ঘটিবাটি বেচে দিয়েও দরাজদিল তখন মাস্টারমশাই । মাত্রা ছাড়ায় প্রায়ই। কখনও আবার শান্ত, দিব্যি দার্শনিক।
আজ এলেন একটু খুঁড়িয়ে।

-পায়ে কি হ’ল? জিগ্যেস করি।

— কিছুই না ডাক্তারবাবু, চমৎকার আছি আমি…শুধু পায়ে মন রেখে চলা হয়নি তো ক’দিন….তাই রাস্তায় একটু পড়ে গেসলাম !
আজ যেন সেই দার্শনিক মনটা ফিরে এসেছে।

-পদস্খলন হয়েছে তবে, তাই বলুন! ওষুধপত্তর ঠিকঠাক খাচ্ছেন তো?
আমার কেমন সন্দেহ হয়।‌পূর্ব ইতিহাস বলছে,এ লোক মাঝে মাঝেই ওষুধ বন্ধ করে।

— বিলক্ষণ খাচ্ছি স্যার, তবে শেষ ক’টা দিন আর দরকারই পড়ছেনা ওষুধের! তোফা আছি তো!
দর্দ্ মিন্নতকশ-এ-দাওয়া ন হুয়া, ম্যয় না অচ্ছা হুয়া, বুরা ন হুয়া! কী হবে ওষুধে স্যার, ও আমার খেলেও যা, না খেলেও তা!
মির্জা গালিবের রসধারা খানিক ছিটিয়ে দিয়ে যেমন এসেছিলেন তেমনই খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাস্টারমশাই ফিরে যান। প্রমাদ গনি আমি। তবে পায়ে মন রাখার কথাটা মনে রয়ে যায়।

আরও একটি মেয়ে এলো একদিন। শক্ত মনের মেয়ে। শরীরেও পোক্ত, স্পোর্টস কোটায় সরকারী চাকরি পেয়েছে। ছোটাছুটির চাকরী, দৌড় ঝাঁপ অনেক।
সব ভালো মেয়ের, তবে স্নান করতে অনেক বেশি সময় লাগে, কাজের ক্ষতি হচ্ছে নিয়মিত। খানিক কথা বলে বিধান দিই, রুটিন মাফিক যা যা বলার বলি। ওষুধ ছাড়াও আর কি কি করনীয় তাও বলি।মেয়েটি আবার আসে। প্রতি মাসেই আসে। তার হাত ধোওয়া, স্নান করার বহর কখনও বাড়ে, কখনও একটু কমে। স্পষ্ট বুঝছি, ও মোটেই ভালো নেই। বাতিকের লক্ষণ তো বাড়ছেই, মুখে হাসি নিয়েই এ মেয়ে ভেতরে ভেতরে বিষাদ প্রতিমা। ওষুধ বদলে দিই, অবসেশন কমপালশনের রোগীদের জন্য যেসমস্ত থেরাপির ব্যবস্থা,তাও শেখাই নতুন করে। একসময় ধৈর্যচ্যুতি ঘটে আমার। নিয়মিত আসাটা বাদ দিলে, এ মেয়ে আর কিছুই শুনছে না। ও কি রোগটাকে নিয়েই বেঁচে থাকবে? তাহলে তো না এলেই পারে।
কথাটা বলেই ফেলি। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে সে। তার পর বলে,
ওষুধ গুলো আমি খাইনি ডাক্তারবাবু!
তবু আপনি আমায় আপনার কাছে আসতে বারণ করবেন না প্লিজ!আবার কয়েক মিনিট চুপচাপ। তারপর বললে, একটা কথা কক্ষনও কাউকে বলতে পারিনি স্যার, আজ আপনাকে বলি?

নীরবে সম্মতি দিই।

— বাবার মৃত্যুর সময় আমার বয়েস চোদ্দ। মা আগলে রাখত আমায়। আর আমি প্রতিজ্ঞা করি, নিজের পায়ে দাঁড়াব।
খেলাধুলোয় ভাল ছিলাম। আরও খাটা শুরু করলাম। প্রথমে জেলা, তারপর রাজ্যস্তরে খেললাম। নাম হ’ল একটু। কলেজে ভর্তি হলাম আর এদিকে চাকরীর চেষ্টাও করছি। সুযোগও এলো। যে বিভাগের চাকরী পেলাম
বাবার এক বন্ধু তার সবচে উঁচু পোস্টে । জেঠু বলতাম,
ওনার সাথে দেখা করতে গেলাম শুরুতেই। খুশি হলেন খুব, আমিও বেশ ভরসা পেলাম। নতুন চাকরী, এদিক ওদিক প্রচুর ছুটতে হচ্ছে। উনি মাঝেমধ্যেই ডাকতেন, সবসময় যে যেতে পারতাম তা নয়।
অফিস কলিগ এক দিদি একদিন জিগ্যেস করেছিল, সাহেব কেউ হয় নাকি তোর? ভাবলাম, অফিস জেলাসি, আর কি! নতুন চাকরীতে বেশি পাত্তা পাচ্ছি কিনা আমি।

মাস পাঁচেক হ’ল চাকরীর। একটা ঘটনা ঘটল। বৃষ্টির দিন ছিল, সারাদিন বৃষ্টি। কাজকর্মের চাপে সেদিনও বেরোতে সন্ধে হয়ে গেল। অফিস শুনশান, নিচে দাঁড়িয়ে জলের ছাটে ভিজে যাচ্ছি, ভাবছি বাড়ি ফিরব কেমন করে! হঠাৎ দেখি স্যারের গাড়িটা বেরোচ্ছে, আমায় দেখতে পেয়ে ডেকে নিল জেঠু।
আবার চুপ করে মেয়ে।
–এটা সেটা কথা হচ্ছিল গাড়িতে। কাজকর্ম কেমন হচ্ছে,অসুবিধে হচ্ছে কিনা,এইসব। তারপর অনেক ব্যক্তিগত প্রশ্ন, বিয়ে করব কিনা, প্রেম করি কিনা, করলে কদ্দূর কি হয়েছে…আমার না বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল–হঠাৎই বললেন, ভিজে গেছিস তো, আমার ওখানেই একটু চানটান করে ফ্রেস হয়ে নিস্…
আমি কথাগুলো বুঝতেই পারছিলাম না, বললাম, না, না, আমায় ওই পরের মোড়টায় নামিয়ে দিলেই হবে, ওখানেই আমার পিজি তো!
উনি পাত্তাই দিলেন না, বরং– আরে আমার ওখানে চাকরবাকর ছাড়া কেউ নেই, তোর অসুবিধেটা কি?
আমার ইন্দ্রিয় ততক্ষণে সজাগ হয়ে গেছে। স্পষ্ট বুঝে গেছি ওসব বাবার বন্ধুটন্ধু কিছু না,লম্পটের পাল্লায় পড়েছি ।
দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, এই মুহূর্তে গাড়িটা থামাতে না বললে আমি কিন্তু অনর্থ করব!
গাড়ি থামল। নামতে নামতে শুনলাম, কী সব মেয়েছেলে! একটা খেলাধুলো করা মেয়ে এত আনস্মার্ট!
কান মাথা জ্বলে যাচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটছিলাম। কতক্ষণ হেঁটেছি, কতদূর হেঁটেছি মনে নেই আর। মনে হচ্ছিল আমার সর্বাঙ্গে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছে কেউ। ঘন্টাখানেক, নাকি তারও বেশি সাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়েছিলাম ফিরে এসে। কিছুতেই যেন গায়ের নোংরা গুলো তুলতে পারছিলাম না। কাঁদছি আর ভাবছি, আমারই দোষ, নইলে আমার সাথেই বা এমনটা হবে কেন? বাবার ওপর রাগ হচ্ছিল খুব– বাবা যেন আমাকে একটা মেলার মাঠে ছেড়ে দিয়ে হারিয়ে গেছে, কোথায় যাব আমি?

এতক্ষণে কান্নায় ভেঙে পড়েছে মেয়ে। এবার হয়ত একটু সহজ হবে।
–ক’দিন পর অফিসে ফিরে জানলাম আমি বদলি হয়েছি শিলিগুড়ির অফিসে। আপনি জানেন স্যার, আট বছর আগে বিয়ে করেছি আমি, পাঁচ বছরের একটা ছেলে আছে আমার। চাকরীতে প্রমোশনও হয়েছে। তবু যখনই একলা হই, কোথা থেকে যেন চিন্তার দলাগুলো মনের মধ্যে এসে অস্থির করে তোলে। মনে হয়, আমি একটা ভীষণ খারাপ মেয়ে, নোংরা মেয়ে! কাউকে কখনও বলতে পারিনি কথাগুলো, যদি খারাপ ভাবে আরও!
আপনি আমার চিকিৎসা করবেন তো স্যার?

চুপ করে বসে থাকি। কীসের চিকিৎসা, কিইবা ওষুধ! মাস্টারের কথাটা মনে আসে, অচ্ছা ন হুয়া, বুরা ন হুয়া। তবে ঈশান কোনে ঈশানীর দেখা মিলেছে যখন, রাস্তা একটা মিলবেই।


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, এপ্রিল ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 1 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Rudra Kinshuk
Rudra Kinshuk
3 days ago

খুব ভালো লাগলো

Dipak Banerjee
Dipak Banerjee
3 days ago

খুব ভালো লাগলো তোমার লেখার গুরুত্ব অনেক!
প্রতি মাসে লেখা পেলে খুব খুশি হব।

Ivy Chattopadhyay
Ivy Chattopadhyay
18 hours ago

মনের গহীনে যে কত কষ্ট লুকিয়ে থাকে!