
জলপিপি

আজকাল মেয়েকে চিনতেই পারে না কাকলি । কাল বাদে পরশু একটা শুভ দিন । নববর্ষ । নতুন শাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন বেয়ান আগেই । বারবার ফোন করে বলছেন, যেন নববর্ষের শুভদিনের আগে নিজের বাড়ি ফিরে যায় পর্ণা । মৃণাল অবশ্য ফোন করে নি । হয়ত পর্ণার সঙ্গেই কথা বলে নিয়েছে, কখন কিভাবে এসে নিয়ে যাবে । কিন্তু মেয়েকে দ্যাখো ! কাল রাত সাড়ে বারোটা করে বাড়ি ফিরল, আজ আবার দুপুর হতে না হতেই বেরিয়ে গেল । বছর শেষের উইকেণ্ড কাটাতে সর্বাণীদের ইছাপুরের বাগানবাড়ি । শ্বশুরবাড়ি যাবি কখন, বলবি তো !
ওইটুকু দুধের শিশুকে ফেলে বাপের বাড়ি চলে এলি, বন্ধুদের সঙ্গে নাকি গুচ্ছের প্ল্যান । নেহাত অমন প্রশ্রয়দাতা স্বামী, শাশুড়ি-শ্বশুর । তবু বাচ্চাটার টানেও তো এসব হুজুগ বাদ দেওয়া যায় !
অদ্ভুত মেয়ে ! অদ্ভুত স্বভাব ।
অবশ্য ছোট থেকেই অদ্ভুত । কেমন আলগা আলগা । ছাড়া ছাড়া ভাব । কারো সঙ্গেই তেমন গলাগলি সম্পর্ক হয় নি মেয়ের । মা নয়, বাবা নয় । অমন যে মায়া করতেন ঠাকুমা, তাঁর সঙ্গেও নয় ।
বাড়ির কোনো জিনিসে মায়া নেই, ঘর গুছোনো নেই, নিজেকে সাজানো নেই । নিজের পুতুল-খেলনা থেকে বইপত্র জামাকাপড়, মায়া করে তুলে রাখা নেই । আশেপাশের জগত নিয়েও অস্বাভাবিক নির্লিপ্ত । দূর থেকে যখন হেঁটে আসত, মনে হত পায়ের পাতাগুলো মাটির ওপর ভেসে রয়েছে । এমনিতে পর্ণার পায়ের পাতা বেশ বড়, চোখে লাগার মত বড় । অদ্ভুত কৌশলে মাঠের ঘাস, ছোট ছোট গুল্ম লতা, ঝরে পড়া শুকনো পাতার ওপর দিয়ে আলগোছে হেঁটে আসত মেয়ে । বৃষ্টি হলে খুব আনন্দ । জমে থাকা জলের ওপর দিয়ে, গাছপাতা মাড়িয়ে আলগোছে এমন হেঁটে আসত, যেন উড়ে আসছে । পাখির মতো ।

শাশুড়িমা ডাকনাম দিয়েছিলেন । পিপলি । মুখে মুখে পিপি । শাশুড়িমা বলতেন, ‘ঠিক ঠিক নাম হয়েছে । এক্কেবারে ঠিকঠাক । পিপি । আমার জলপিপি ।‘
বাংলাদেশের গ্রামের মেয়ে ছিলেন, অনেক পাখি চিনতেন । জলপিপি পাখি নাকি ঠিক এইরকম । জলের পাখি, জলেই বাস । বড় বড় পায়ের নখ । অদ্ভুত কসরতে শাপলা পদ্ম কলমীলতার ওপর দিয়ে এমনভাবে হেঁটে যায়, যেন মগ্ন সাধক হেঁটে চলেছে জলের ওপর দিয়ে । পাখি আকারে বড় নয়, কিন্তু পায়ের পাতা খুব বড় । জল, জলের সব গাছ বড্ড প্রিয় । আর কোনো জলের পাখি সারাজীবন ভাসমান লতা গুল্ম খড়কুটোর ওপর কাটিয়ে দেয় না । অ্যালার্মের মতো পিপ-পিপ আওয়াজে ডাকাডাকি ।
হ্যাঁ, ছোটবেলায় খিদে পেলে, ঘুম পেলে, পেটে ব্যথা করলে অমন পিঁ পিঁ করে কাঁদত পর্ণা । আর শাশুড়িমা উছলে উঠে বলতেন, ‘দেখেছ? দেখেছ? ঠিক যেন জলপিপি পাখি একটা ।‘
মজাই পেত কাকলি-সুশান্ত । সুশান্ত মেয়েকে পিপলি-পাখি বলে ডাকত মাঝে মাঝে । বই খুলে খুঁজে খুঁজে জলপিপির ছবি দেখিয়েছিল । বেশ সুন্দর দেখতে পাখিটা । কালো শরীরে হলদে ঠোঁট, ধূসর রঙের ডানা, নীলচে গলা, লাল লেজ, মাথায় চমত্কার একটা সাদা দাগ । মেয়েকে জলপিপি পাখি ভাবতে অসুবিধে হয় নি ।
শাশুড়িমাই অবশ্য পরে অন্যরকম বলতে শুরু করলেন । ‘মানুষ মানুষের মত হলেই ভালো, না বৌমা ? পিপিপাখি কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে । আমার ভয় করে ।‘
কেন যে এমন উড়ু-উড়ু ভাবভঙ্গী । ঘরে মন বসে না কেন ?
সুশান্ত হাসত খুব, ‘অন্যরকমই তো ভালো । পিপি একটু আনমনা, একটু আলাভোলা । একটু অন্যমনস্ক, নিজের মনে থাকতে ভালোবাসে । খারাপ কি ?’
আনমনা, আলাভোলা হলে খারাপ কিছু নয় । কিন্তু পিপি বড্ড নির্মোহ । মায়া মমতা আছে কিনা বোঝা যায় না । সুশান্তকে সব কথা বলতে পারে না কাকলি, কিন্তু টেন-ইলেভেনে ছাত্রী থাকার সময় থেকেই পিপির স্বভাবে কিছু কিছু গলদ ধরতে পেরেছে কাকলি । তিন চারটে ছেলে বন্ধু, রুবন শেখর রাজেশ অনন্য সবার প্রতিই টান । হৈ হুল্লোড়, হাসি মজা । জীবনটা যেন কেবল মজার জিনিস । মেয়েবন্ধুও আছে, কিন্তু ছেলেদের সঙ্গে বেশি ভাব । মেয়েটা স্বভাব-চরিত্রে ভালো হবে তো ? বড় ভাবনা হয় ।
এতগুলো ছেলেবন্ধু, কিন্তু তাদের কারো সঙ্গেও সিরিয়াস হল না । রুবন বেশ পছন্দ করত, পিপি পাত্তা দিল না । হাল ছেড়ে চলে গেল রুবন, সমীর এসে জুড়ল । সমীরের সঙ্গেও আলগা ভেসে রইল । অনন্য তো বেশ রাগারাগি করে ছেড়ে গেল । মেয়ের হেলদোল নেই । কারো জন্যে মনখারাপ করে কিনা তা-ও বোঝা যায় না । ততদিনে কলেজ যাচ্ছে পিপি । একগাদা নতুন ছেলে বন্ধু ।
‘আজকালকার মেয়েদের আমরা বুঝব না বৌমা । ওদের বোধহয় আলগা থাকা স্বভাব ।‘ শাশুড়িমা বলতেন ।
তা হবে কেন ? পিপির স্কুল-কলেজের মেয়ে-বন্ধুরা তো সবাই অমন নয় । অমন বাঁধনছাড়া, অমন ভেসে বেড়ানো ধরন । একটা বয়সের পর সবাই থিতু হয়েছে ।
‘বিয়ে হলে ঠিক হয়ে যাবে । সংসারে মন বসলে সব উড়ে বেড়ানো শেষ । ভেবো না’, শাশুড়িমা সান্ত্বনা দিতেন । তারপর তো হঠাত্ করে নিজেই অচিন আকাশের পাখি হয়ে গেলেন । আদরের পিপিপাখির সংসার দেখে যাওয়া হয় নি ।

ভাগ্যিস ! নইলে বড্ড আঘাত পেতেন । পিপি যে এমনটা করবে, কেউ কি ভাবতে পেরেছে ? চমত্কার ছেলে মৃণাল, জামাই নিয়ে খুব সুখ পেয়েছে কাকলি-সুশান্ত । বেয়াই-বেয়ানও ভালোমানুষ, পর্ণা বলতে অজ্ঞান । চোখে হারান । বেশ একটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেছে । সংসারে বেশ মানিয়ে নিয়েছে পিপি । মৃণালের সঙ্গে বিয়ের পর বিদেশ বেরিয়ে এল, শাশুড়িমায়ের সঙ্গে বেনারস । সবই তো ঠিকঠাক চলছিল ।
মাঝে মাঝে এবাড়ি এসেছে, বাপের বাড়ি থাকার সময়টায় পুরোনো বন্ধুদের জড়ো করে হুল্লোড় করেছে । ওই পর্যন্ত । বাড়াবাড়ি করে নি । কাকলি-সুশান্ত নিশ্চিন্তই হয়েছে ।
ফোন করে বেয়ান হাসি হাসি গলায় যেদিন সুখবর দিলেন, ‘এবার একটা নতুন পুতুল আসছে কাকলি’, আরো নিশ্চিন্ত হয়েছিল । যাক, মেয়েটা থিতু হল । সংসারে মন বসেছে ।
গাবলু গুবলু একটি ছেলে । পিপির শাশুড়ি নাতি পেয়ে বৌমাকে আরো ভালবাসছিলেন ।
অথচ এই সময়ই দুধের শিশুকে শাশুড়ির কোলে রেখে বাপের বাড়ি ফিরে এসেছে পিপি ।
কি হয়েছে, মৃণালের সঙ্গে সমস্যা নাকি শ্বশুরবাড়িতে, কিছুই বলে না ।
‘হবে আবার কি, ক’দিন ঝাড়া হাত-পা হয়ে থাকতে এসেছি । থাকতে দেবে না ?’
ওবাড়ির সবাইও অবাক । অবাক না বলে হতবাক বলাই ভালো । তবু বলেছেন, ‘অনেকগুলো দিন বড্ড ধকল গেছে । থাক, একটু বিশ্রাম নিক বরং ।‘
ধকল আবার কি ? পৃথিবীতে কোন মা মাতৃত্বকে ধকল মনে করে ? ন’মাসের গর্ভযন্ত্রণা এক নিমেষে কেটে যায় গর্ভজাত সন্তানের মুখখানা দেখে । হ্যাঁ, এসময় অনেকের শরীরে মনে কিছু পরিবর্তন হয় । হরমোনের প্রভাবে । হয়ত পিপিও তাই এমন অস্বাভাবিক আচরণ করে বসেছে । মনকে বুঝ দিয়েছে বাকি সবাই ।
‘এ মাসটা থাকুক ওখানে’, মৃণাল বলেছে ।
‘হ্যাঁ, নরম শরীর এখন, মাযের কাছে যত্নে থাকুক । এই তো নতুন বছর আসছে, তখন ফিরে আসবে ।‘ পিপির শাশুড়িমা বলেছেন ।
‘আমি দাদুভাইকে যত্নে রাখব, তুমি ভেবো না পিপি’, এমন শাশুড়ি অনেক ভাগ্য করলে মেলে ।
শাশুড়িমাযের ‘দাদুভাই’ নিয়ে, তার যত্ন নিয়ে পিপির মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় নি । প্রতিবেশী থেকে আত্মীয়, পারিবারিক বন্ধু থেকে পিপির বন্ধুরা, সবাই অবশ্য যথেষ্ট মাথাব্যথা দেখিয়েছে ।
‘কি করে এমন পারলি পিপি ?’
‘এইটুকু শিশুকে শাশুড়ির কাছে দিয়ে চলে এলি ?’
‘কেমন বাপ-মা যে মেয়েকে শাসন করে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেয় না ?’
ওবাড়িতেও একই ছবি । ‘এমন বৌকে শাস্তি না দিয়ে প্রশ্রয় দিচ্ছ ?’
‘এত অপমান সহ্য না করে ডিভোর্স দিচ্ছে না কেন মৃণাল ?’ হিতৈষীরা বলেছেন ।
কাকলি-সুশান্তও বারবার জানতে চেয়েছে, সত্যিই ওবাড়িতে কিংবা মৃণালের সঙ্গে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা । মানিয়ে চলাটা আজকের দিনে বাধ্যতমূলক নয় । ছোট্ট পুতুলকে নিয়ে এসে এবাড়িতেই মাথা উঁচু করে থাকুক মেয়ে ।
নাহ, কিচ্ছু বলে নি মেয়ে । মৃণালের সম্পর্কে, শ্বশুর-শাশুড়ি সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নেই । ছোট্ট পুতুলের দায়িত্ব নিয়েও আপত্তি আছে বলে মনে হয় না । মৃণালের সঙ্গে, শাশুড়ির সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় ছেলের খবর নেয় । কিন্তু এইটুকু শিশুর যে মাযের সঙ্গটাই সবচেয়ে জরুরী, তা বোঝে না পর্ণা । প্রতিবেশী হিতৈষী আত্মীয় স্বজনবন্ধুদের জবাব দিতে দিতে প্রাণান্ত ।
গভীর ভাবনায় ডুবে ছিল কাকলি, ফোনের আওয়াজ কানে যায় নি ।
‘কি হল ? ফোন তুলছ না কেন ?’ সুশান্ত ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে ।
মৃণালের ফোন । ‘কি বলব, বলো তো ? পিপি বেরিয়ে গেল । কখন আসবে বলেও গেল না । মৃণাল যদি জিজ্ঞেস করে, কখন পিপিকে নিতে আসবে ? কাল বাদে পরশুই তো নববর্ষ…’
‘ফোন তো বেজে বেজে থেমেই গেল । আর ফোন করার দরকার নেই । চলো, আমরাই একবার ওবাড়ি যাই । মেয়েকে ওবাড়ি পাঠানো দরকার । দেখি, ওঁরা কি ভাবছেন ।‘
‘সত্যি, মেয়েটা মান-সম্মান বলে কিছু থাকতে দিল না । কি লজ্জা যে করে আমার ।‘ বলতে বলতে রেগে উঠল কাকলি, ‘পাখি পাখি বলে তোমার মা-ই আরো পিপির মাথাটা খেয়েছেন । শুনলে না, বেয়ান কেমন বললেন ? পর্ণা আমাদের পাখি-মা, উড়ু উড়ু মন তো একটু হবেই । যতই ভাল হোক, শাশুড়ি তো । নিন্দে করার সুযোগ ছাড়বে কেন ?‘
‘না না, অমন বোলো না । অনেক ভাগ্য পিপির, তাই এমন শাশুড়ি পেয়েছে । অন্য কোনো বাড়ি হলে…’
‘শুধু শ্বশুর-শাশুড়ি কেন ? মৃণালকে দ্যাখো । অন্য কোনো স্বামী হলে…’
বাবা-মা মানেই সন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তা । এবাড়িতে এসেই অবশ্য চিন্তা থেকে মুক্তি । হাসিমুখে বেয়াই দরজা খুলেছেন, ‘পর্ণা ফোন করেছিল । কাল সকালে আসবে ।‘
ফোন করেছিল পিপি ? যাক বাবা, নিশ্চিন্ত ।
‘মৃণাল কোথায় ? ফোন করেছিল, তুলতে পারি নি । তাই চলেই এলাম ।‘
বেয়ানও হাসিমুখ, ‘মৃণাল ? ওই তো ঘরে । ছেলে নিয়ে ব্যস্ত । এই তো অফিস থেকে ফিরে দুধ খাওয়ালো খানিক আগে । এখন বোধহয় ছেলের বিছানা পরিষ্কার করছে । যান না আপনারা ।‘
ঘরে ঢুকে নাতিবাবুর মুখখানা দেখে আরো শান্তি । মৃণাল ছেলেকে সারা গায়ে পাউডার মাখিয়ে জামা পরিয়ে দিচ্ছে । একাগ্র, মগ্ন । থমকে দাঁড়াল কাকলি ।

জলপিপি পাখির কথা মনে পড়ে গেল । স্ত্রী-জলপিপি একই সিজনে চার থেকে পাঁচবার ডিম দেয় । আর একটা আজব ব্যাপার আছে । প্রজননের সময় স্ত্রী-পাখি চার-পাঁচটি পুরুষ-পাখির সঙ্গে সংসার বাঁধে । এক জায়গায় ডিম দিয়ে আরেক পুরুষ-পাখির কাছে চলে যায় । পুরুষ-পাখির ওপর সব দায়িত্ব পড়ে অনাগত সন্তানের দেখাশোনার । ডিমে তা দেওয়া থেকে শুরু করে লালন পালন সবই করে পুরুষ-পাখি । তারপর একদিন ফিরে আসে স্ত্রী-পাখি । পাখিদের সংসারের আজব গল্প করতে গিয়ে খুব হেসেছিল সুশান্ত ।
মৃণালকে দেখতে দেখতে, পুরুষ-পাখির কথা ভাবতে ভাবতে অকারণেই চোখ ভরে জল এলো কাকলির । জলপিপির স্বামী বলে কথা ! অন্যরকম হবে কেন?
পিপিকে নিয়ে আর ভাবনা নেই ।

অভিনব গল্প। কী নিপুন ও বিচিত্র মুন্সীয়ানায় বোনা বিভিন্ন রঙের সুতো।
পাঠ করে আমার আনন্দ সংবেদ পাঠালাম।
ভরসা পেলাম l 🙏
গল্প খুব ভালো লাগলো।
অভিনন্দন।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই l
খুব সুন্দর লাগলো। নানা রঙের জীবন…..
আপ্লুত l ভরসা পাই এমন feedback পেলে l
বেশ অন্যরকম গল্প। ভালো লাগলো।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।