
একটি হিসেব ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
খুব সহজ এই হিসেবটা দিয়েছিলাম দু’বছর আগেই। আর বর্তমানে বাংলার ছোট্ট একটি শহরে ৩০ টি স্কুল বন্ধ হবার তালিকাভুক্ত। আবার দিই হিসেবটা। কেমন!
আমাদের রাজ্যে মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা কমবেশি ৬,৫০০টি। এই স্কুলগুলির জন্য জমি সব দানকৃত। স্কুলগুলো বেশিরভাগ খুব প্রাইম লোকেশনে। স্কুলগুলোর এক্তিয়ারে গড়ে জমির পরিমাণ কমবেশি ২বিঘা। তা’হলে মোট জমির পরিমাণ ৬,৫০০×২বিঘা = ১৩০০০ বিঘা। এটা নিতান্তই কম করে ধরা। ভাবতে পারছেন শহর ও শহরতলীর প্রাইম লোকেশনে এই জমির মূল্য কত হতে পারে!!?
প্রসঙ্গত কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে চন্দননগরের শতাব্দী প্রাচীন নামকরা একটি স্কুল নাকি কর্পোরেটকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেন? কারণ, সেই স্কুলে ইদানীং ছাত্র ভর্তি হচ্ছে না। কেন! এমন এক বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে ক্রমশঃ রোজ রোজ যে – ‘সরকারি স্কুলগুলো গ্যাচে! আর পড়াশোনা হয় না! সব গোল্লায়! এই তো অবস্থা!’ এই অপবিশ্বাসের প্রচারের অংশ এই সম্পূর্ণ খেলাটি। ‘ভয়ঙ্কর খেলা হবে’ – উচ্চারণে হেসেছেন। আসলে ওটা একটা ন্যারেটিভ সমাজে রেজিস্টারড করার। হয়েছেও তাই। রোজ কাচুমাচু মুখে ধরা পড়ছে একজন আর সে বেরুচ্ছে বীরবিক্রমে, ছুঁড়ে দিচ্ছে বুমারের দিকে থুতুর মতো একটি নাম, রে রে করে মিডিয়া দৌড়চ্ছে! পাবলিক অসুস্থ বাপকে নার্সিংহোমে ভর্তি করাতে গিয়েও এক ঝলক দেখে নিচ্ছে আজ কে কে রে! কার ফ্ল্যাটে টাকা! কে গেল জেলে! খেলা না!!
বিষয়টি এখানেই। পুরো শিক্ষা বিষয়টাই একটা এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – যেখানে লক্ষ্য শিক্ষার প্রসার নয়, লক্ষ্য ঐ ১৩০০০ বিঘা most costly land property!
তারই ফলশ্রুতি এই ‘অঙ্কুর’ প্রকল্প। বুনিয়াদি শিক্ষার মেরুদন্ড ভাঙার প্রকল্প। সিভিক পুলিশ দিয়ে প্রাইমারি স্কুলে পড়ানোর প্রস্তাব। রাজ্য পুলিশের মোট সংখ্যার তুলনায় অনেক গুন বেশি আজকে সিভিক ভলান্টিয়ারের সংখ্যা। যেমন সরকারি কর্মচারীদের থেকে ক্রমশঃ বেশি হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা। এই সিভিক বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের কোনো দায় নেই শুধু নয় তারা সবসময়ই দলতুষ্টির উপর নির্ভরশীল। ভাবুন। ভাবা প্র্যাকটিস করুন। গোটা প্রশাসনের কঙ্কালসার চেহারাটা!
খুব সুচতুর ভাবে আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আমাদের প্রশাসন, আমাদের আইন শৃঙ্খলা এবং সার্বিকভাবে সবকিছুকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেবার শুরুয়াৎ এই পদক্ষেপগুলি। সমাজ স্বীকৃত একটি ন্যারেটিভ। কারণ, সরকারি সব গ্যাচে রে, সরকারটাই চোর তো কী হব্যা! এ কোথায় যাচ্ছি! আমরা, এই ল্যা ল্যা ল্যা, জ্বর, সর্দি, আমাশায় জর্জরিত আমরা তো কোনোদিন এই জায়গায় যেতে চাইনি!
চিরদিন এই বাঙালি জিরজিরে বুকে আগুন নিয়ে আগলে রেখেছিল নিজের বাংলা। ঐ ঐ রোগা রোগা ডিগডিগে বাঙালি ধুতি, পাজামা, পাঞ্জাবি পরে শহরের রাস্তায় রাস্তায় আগুন ছড়িয়েছিল। সেই বাঙালি কোথায়!! আজকেই তো ‘জেগে থাকাই ধর্ম’।
বাংলা আজ গবেষণাগার নয়তো! পুরস্কার আসছে তো বিভিন্ন ‘শ্রী’ তকমার!! আসছে তো নতুন এক সংস্কৃতি, আরেকটি ন্যারেটিভ – আইন আইনের পথে চলছে। বিচার ব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখানোর খেলা। জমি তো ফেরত দিতে চাই কিন্তু বিচারাধীন! চাকরি তো দিতেই চাই কিন্তু কোর্ট!

শিক্ষায় দুর্নীতি! প্রমাণ হয়েছে!? অ্যাঁ! অভয়া ধর্ষণ ও খুন! প্রমাণ হয়েছে!? বিচার!! রোজ রোজ খুন, ধর্ষণ – ধুর্ ধুর্ প্রমাণ হয়েছে! বিচার? আইন চলছে আইনের পথে, ধর্ষক চলছে ধর্ষকের পথে, সরকার চলছে সরকারের পথে! আইন কি সরকার তৈরি করে না? আইনের শাসন কি সরকার চালায় না! আইন রক্ষা করার দায়িত্ব কি সরকারের নয়? মানেটা কী! ঘেঁটে ‘ঘ’ করার মতো ইচ্ছাকৃত নানা ধরনের বাইনারি নামিয়ে যাও। আপাত সঠিক মনে হবে। কিন্তু ব্যাপক বেঠিক!
কোনো অন্যায়ের বিচার নেই। বিচার চাইছে না কোনো সংসদীয় দল, তারা শুধু দোষারোপ করে প্রমাণ করতে চায় ‘সি’ টিম ‘এ’ টিমের চেয়ে ভালো। ‘ক’ এর সময় এই হয়েছে ‘খ’ এর সময় নিয়ম কেন! ঘন্টা খানেক ক,খ,গ,ঘ, এর প্যানেল ডিসকাসন! কিন্তু অন্যায়ের বিচার!
বিচারহীনতা একটা সংস্কৃতি। ধীরে ধীরে নামিয়ে আনা হচ্ছে! সমাজে রেজিস্টার্ড হয়ে যাচ্ছে! ধোওওড়্ সওওব জামিন পেয়ে যাবে! কারও কোনো বিচার হবে না! শুনলুম সঞ্জয় নাকি বিরিয়ানি সাঁটাচ্ছে জেলে বসে! তা কি করব্যা!
বিচারহীনতা এক নয়া গণতান্ত্রিকতার আড়ালে স্বৈরাচারী সংস্কৃতি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জাল ওষুধ, খুন, ধর্ষণ, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি – কালো ব্ল্যাকবোর্ড আর ফাঁকা বেঞ্চির দিকে নীরব দুপুরে কেঁদে ফিরে যায়। কোথাও কোনো বিচার নেই! শিক্ষার চারাগাছ বুটের তলায় পিষে দিলে কোন বুকের গভীর থেকে উঠে আসবে চিৎকার – বিচার চাই, বিচারহীনতা একটা সংস্কৃতি, তার নির্মূল চাই! সেই স্বর উঠে আসার আগেই গলায় নুনের পুঁটুলি ঠুঁসে ঠুঁসে দিচ্ছে! কোথাও কি ফুঁসে ওঠার নতুন কবিতা লেখা হচ্ছে এই বসন্তে!?

লেখাটা পড়তে পড়তে একটা সর্বগ্রাসী অন্ধকারের কবলে আমরা
ভয় হচ্ছে l একেবারে ঠিক ঠিক পর্যবেক্ষণ l সত্যিই ভয় হচ্ছে l