
অঙ্গারেওয়ালি রসিদ জাহান
অনুবাদঃ

৩য় পর্ব
আসিফ জাহানের পুত্রবধূ
আসিফ জাহানের স্বামী একজন ধনী ডেপুটি কালেক্টকার এবং তাদের একমাত্র পুত্র, নুর-উল ইসলাম, জন্মগ্রহণ করে বেশ কয়েকটি শিশু সন্তানের মৃত্যুর পর। সে সবার চোখের মণি। এমন কেউ নেই যে হাসিমুখে তাদের মেয়েকে তার সঙ্গে বিবাহে আবদ্ধ করতে রাজী হবে না। কিন্তু, আসিফ জাহানের হৃদয়ের আন্তরিক ইচ্ছা যে সে তার পুত্রের জন্য একমাত্র কুবরা-এর মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে পাবে।
সে এমন এক নারী যে যা সঠিক তা করতে পিছপা হবে না। কেন সে কুবরা’র কন্যাকে নিজের ঘরে আনতে চায়? কারণ, একদিকে সে তার স্বামীর সর্বকনিষ্ঠা ভগিনী, তেমনি অন্যদিকে সে তার ভাতৃবধূ, কারণ কুবরা’র বিবাহ হয়েছে আসিফ জাহানের ভাইয়ের সঙ্গে। বিশেষভাবে এই দূরদর্শিতার কারণেই আসিফ জাহান তার পরিবারের সবার কাছে খুব ভালোবাসার পাত্রী। সে যদি তার পুত্রের বিবাহ নিজের পরিবারের কারুর সঙ্গে স্থির করতো তাহলে তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা মুখ গোমড়া করতো। অন্যদিকে সে যদি তা নিজের শ্বশুরবাড়ির মধ্যে করতো, তাহলে তার বাপের বাড়ির লোকজন দুঃখ পেত। কুবরা’র কন্যাকে নিয়ে এলে তার পরিবার এবং তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন উভয় তরফের সবাই খুশি হবে।
আল্লার দুয়ায় কুবরা বেগম প্রতি বছরই সন্তান প্রসব করতো এবং পঁচিশ বয়সে সে পাঁচ পুত্রের গরবিনী মা হয়ে গেছে। পুরো পরিবারের লোকজনের মুখে তার ভাগ্যের কথা ফেরেঃ প্রত্যেকেই স্বীকার করে প্রত্যেক মেয়েই যেন কুবরা’র মতো সৌভাগ্যশালী হয়। প্রত্যেকবার যখন তুমি তাকে দেখবে, দেখবে তার কোলে এক শিশুপুত্র খেলা করছে। এটা তো ঠিক, যে কেউ শত্রুরও কন্যা চাইবে না।
প্রতি বারই যখন কুবরা’র আর এক পুত্র সন্তান জন্মায়, সারা জগত যেন হিংসায় ফেটে পরে। কিন্তু, যদি কেউ অখুশি হয়ে থাকে সে হল আসিফ জাহান। এক পুত্র প্রসব যে কত মরণযন্ত্রণা একথা ভেবে সে কুবরা’র সুস্বাস্থ্যের জন্য যেমন খুশি হয় তেমনি যখন আবার পুত্র জন্মায় তখন আসিফ জাহানের চোখের জল আর থামতে চায় না।
‘কার কী করার আছে, বলো? আমারই দুর্ভাগ্য। নয়টি মৃত সন্তানের পর আমি নূর-উল ইসলাম’এর মুখ দেখেছি, আর এখন আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় আশা পূরণ না হওয়া মেনে নিতে পারছি না। যেদিকেই তুমি তাকাও, দেখবে শুধু মেয়ে আর মেয়ে। চারিদিকে এত মেয়ে যে তুমি যথেষ্ট সংখ্যায় পাত্র খুঁজে পাবে না। কিন্তু আমার বেচারা ছেলের জন্যে, আল্লা মিয়াঁ একটি বধূ পাঠাতে কার্পণ্য করছেন!’

গত তিনদিন ধরে কুবরা বেগম শেষ প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছে। পারিবারিক ধাই তার পাশে বসে রয়েছে। পুরো বাড়ি এখন দুই পরিবারের বৃদ্ধা মহিলা, তরুণী এমনকি শিশুদের ভিড়ে গমগম করছে। এমন শোরগোল বেঁধে আছে সবসময় যে তুমি কোন কথা শুনতে পাবে না। বাড়ির পরিবেশ দেখে মনে হবে যেন এক বরযাত্রার জন্য সবাই প্রস্তুত হচ্ছে। মহিলারা নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করে চলেছে যে একজন মহিলা ডাক্তারকে ডাকা হবে কি না। তরঙ্গের পর তরঙ্গ প্রসব যন্ত্রণা আসছে। তবুও শিশুর নির্গমনের কোন চিহ্ন নেই।
আসল কথা, মহিলারা তো প্রসব করেই, কিন্তু কেউ কখনো এমন দীর্ঘস্থায়ী প্রসব বেদনার কথা শোনেনি। এক মেষশাবক বলি দেওয়ার মানত করা হল, গরীবদের শস্য ভিক্ষা দেওয়া হল, কবজ-তাবিজ আনা হলো—সংক্ষেপে সমস্ত প্রকার প্রয়াস নেওয়া হল। তখতের ওপর আসিফ জাহান তার প্রার্থনার কম্বল বিছিয়ে দিল এবং ব্যস্ত ভাবে প্রার্থনা শুরু করলোঃ ‘হে সারা বিশ্বের আল্লা, কুবরা’র ছোট সন্তানদের উপর দয়া করুন আর তাকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিন। হে প্রভু, এইবার আমার কথা শুনুন আর আমাকে একটি পুত্রবধূ দিন। পাঁচবার আমি হতাশ হয়েছি… এবার আমার প্রার্থনা শুনুন।’ তার মুখের প্রত্যেক ছিদ্র থেকে আল্লার করুণা বয়ে আসছে।
কুবরা বেগমের চিৎকার এবং গোঙানি আসিফ জাহানের কানে পৌঁছল। ‘হায়, আপা…আমি আর এইবার বাঁচবো না… আল্লাহ! আমাকে দয়া কর!… আমি মরে যাবো…আমি মরেই যাবো…।’
‘হায়, হায়, কুবরা এমন কথা মুখে এনো না।’
‘জল… জল…।’
‘গুলসাবু…আরি ও গুলসাবু… তুই কোথায়, নচ্ছারি! দেখ, পাত্র ফাঁকা পড়ে আছে…’ অন্দরমহল থেকে কেউ চিৎকার করলো।
কিছুক্ষণ পরে, কুবরা বেগমের চিৎকার সপ্তমে পৌঁছল আর তার সঙ্গে মহিলাদের চিৎকার তীব্রতর হয়ে উঠলো। ‘ভালো মেয়ে… আর একটু চাপ দাও…আরো জোরে চাপ… হ্যাঁ, এই রকম…’ এবং কুবরা বেগমের গলা দিয়ে এমন এক ভয়ঙ্কর চিৎকার বেরিয়ে এল যে আসিফ জাহান ভয়ে হিম হয়ে গেল। তারপরের কয়েক সেকেণ্ড মনে হল যেন কয়েক বছর। তার তখনই এক শিশুর চিৎকার শোনা গেল। আসিফ জাহান যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল আর প্রার্থনার শেষটুকু উচ্চারণ করলঃ ‘হে আমার প্রিয় আল্লা, আপনার ইচ্ছাতেই ঠিক হবে মেয়ে না ছেলে। কিন্তু, আপনাকে ধন্যবাদ যে আপনি কুবরা’র জীবন বাঁচিয়েছেন…’, এই কথাগুলি বলে সে সাষ্টাঙ্গে মাটিতে প্রলম্বিত হল। সে কপাল একটু উঁচু করতেই দেখতে পেল একটি চাকরানি দৌড়ে আসছে, ‘মেয়ে হয়েছে, বেগম সাহেবা, মেয়ে হয়েছে…।’
কুবরা’র সম্পর্কিত বোন এবং ভাই-জায়া বিছানার মাথার দিকে বসে ছিল আর অপর দিকে বসেছিল ধাই, যার পা তখনও কুবরা’র উরুর নীচ দিয়ে প্রসারিত। ভাই-জায়া উঠে মহিলাদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়াল, তার জায়গায় যাতে আসিফ জাহান বসতে পারে।
‘বেচারি কুবরা এই বার এত যন্ত্রণা পেয়েছে, কিন্তু এর সব কারণ তোমার সৌভাগ্য,’ কুবরা’র সম্পর্কিত বোন আসিফ জাহানকে বলল।
‘আল্লা তোমাদের সবার প্রার্থনা শুনেছেন, কারণ আমি এবার সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। যা কিছু ঘটে, তা ভালোর জন্যেই ঘটে। এক মেম আসলে কী আর হতো? সে হয়তো সমস্ত রকমের বস্তু আর যন্ত্রপাতি প্রবেশ করাতো। একটু দেখেই তোমরা সবাই মেমকে ডাকার কথা বলছিলে। এই নচ্ছাড়ি মেমেরা যখন ছিল না তখন কি আমাদের মহিলারা প্রসব করতো না?’ ধাই তীক্ষ্ণ সুরে এই কথাগুলি জোর গলায় বলতে শুরু করলো।
কুবরা’র বোন আইশা বেগম উত্তর দিল–‘আরে, হায়, দেরি হবার তো একটা সীমা থাকবে। এই যে ঘটনা ঘটলো তা তো দুই রাত আর তিনদিন ধরে। সে যন্ত্রণার কাতরাচ্ছিল আর তোমরা জানতে না কতক্ষণ এইভাবে চলবে। আচ্ছা, আমরা কি সন্তান প্রসব করিনি? আমরা কি জানি না স্বাভাবিক ভাবে কতক্ষণ সময় লাগবে?’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, যথেষ্ট বকবক হয়েছে, এখন বলো কখন নাড়ি বেরিয়ে আসবে।’
‘জন্ম আর মৃত্যু আল্লার হাতে, বিবি। কেউ জানেনা কখন সময় হবে। শিশুর জন্ম হয়েছে, নাড়িতে এখনও প্রাণ আছে। দেখ, দেখ… কীভাবে এটা কাঁপছে!’ রূপোর আংটি ভরা ডান হাতে ধাই নাড়ি ধরে আছে আর অন্য হাতে সে কাঁচড়াগুলি সরাচ্ছে। আইশা বেগম গর্ভবতীর পেটে জোরে নীচের দিকে চাপ দিচ্ছে। জন্মের পরে নাড়ি বের করার উদ্দেশ্যে পেট চাপার ব্যাপারে পুরো সমাজের মধ্যে তার খ্যাতি আছে।
‘দুলহন, তুমি কি বেদনা আসার অনুভূতি পাচ্ছো?’
‘না,’ অর্ধমৃতের মতো স্বরে কুবরা উত্তর দিল।
‘নাড়িতে কাঁপুনি কমে আসছে,’ ধাই উত্তেজিত ভাবে বলল। পা আর বাম হাতের মধ্যে নাড়ির দড়িকে ধরে সে তার ডান হাত দিয়ে কুবরা’র পেটে চাপ দিতে লাগলো। তখন কুবরা বেদনা আর ক্লান্তিতে ছাইয়ের মতো হয়ে গেছে।
‘হায়, হায়, মাসি, এখনই দড়ি কেটো না, পুরো নাড়ি এখনও বেরিয়ে আসেনি,’ বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলা বলে উঠলো।
‘আরে, বিবি, তুমি তো কালকা যোগি। আমিই তো তোমাকে এই পৃথিবীতে এনেছি, আর এখন কি করতে হবে তা তুমি আমাকে শেখাচ্ছো? তুমি কি ভাবো শুধু রোদে আমার চুলগুলো সাদা হয়ে গেছে। আল্লার দোহাই, বড়ি বেগম, এই ছুড়িগুলি আমাদের মত ভালো মানুষকেও পাগল বানিয়ে দেবে! আমাকে কি পাগল ভাবো যে বেরিয়ে আসার আগেই আমি নাড়ি কেটে দেবো?’
একদিকে মাসি নাড়ি টেনে যাচ্ছে আর অন্যদিকে মহিলাকুল নিজেদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা বকে চলেছে—তাদের গর্ভাবস্থার সময় কী হয়েছিল অথবা প্রতিবেশির মধ্যে কিছু মহিলার সেই সময় কী হয়েছিল, বা কোন এক মহিলার কথা যে সন্তান প্রসবের সময় মারা যায় আর কীভাবে নাড়ি তার মধ্যে আটকে পড়ে ছিল।
একজন মহিলা প্রশ্ন করলেন, ‘আশিক হুসেনের স্ত্রীর কী হয়েছিল তোমার মনে আছে? নাড়ি বেরিয়ে আসেনি, সন্ধ্যা নেমে এল আর ধাই চেষ্টা করে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত, তাকেও হার মানতে হল আর ঘোষণা করতে হল যে নাড়ি ভেতরে আটকে আছে, তার আর কিছু করার নেই। বেচারিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল আর সেখানে মেম’রা নাড়ি বের করে আনল। কিন্তু, বুয়া, আমি শুনেছি যে সেই মহিলার যকৃৎও বের করে আনতে হয়েছিল। সে তিনদিন পরে মারা যায়, তিনটি ছোট ছা রেখে…।’
‘এক মহিলা ডাক্তারকে ডাকতে হল আর সে ভাই-জায়ার নাড়ি বার করে আনল। পরে সে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিল, তাও তো সে প্রাণে বেঁচেছিল!’
আলোচনায় যখন মেম আর মহিলা ডাক্তারদের প্রসঙ্গ বার বার আসছিল ধাই আর চুপ থাকতে পারলো না। বিরক্তের সুরে সে বলল, ‘কারুরই কম বয়সে মারা যাওয়া উচিত নয়। এখন কি এসব আজেবাজে কথা বলার সময়? মেম আর মহিলা ডাক্তারদের প্রসঙ্গ ছাড়া আর কিছু কি তোমাদের বলার নেই? বড়ি বেগম, একবার ওদের দিকে দেখো…’
‘ধাই ঠিক বলছে। কাইজার, অন্য কিছু বল,’ বড়ি বেগম বললেন।
সঙ্গে সঙ্গে আরো তীক্ষ্ণ সুরে ধাই বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আইশা বিবি, আরো জোরে চাপ দাও। নাড়ি প্রায় বেরিয়ে এসেছে।’
আইশা বেগম ইতিমধ্যে তার বোনের পেট সাঁড়াশির মত ধরে আছে। পায়ের উপর অর্ধেক দাঁড়িয়ে সে আঙুলগুলি দিয়ে আরো চাপ দিতে লাগলো। গর্ভবতী মহিলা তখন যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। ‘আপা, আল্লার দোহাই, এসব বন্ধ করো! এই ভাবে আমি তো মরে যাবো…।’
‘আমরা প্রায় শেষ করে এনেছি, শীগগির তুমি মুক্তি পাবে।’
ধাই নাড়ি পরীক্ষা করল। ‘দেখ, বড়ি বেগম, তুমি নিজে একবার দেখ। পুরোটা এখানে আছে, পরে বোলো না যে কিছুটা ভেতরে রয়ে গেছে।’ এই বলে, আসিফ জাহানের দিকে নাড়িটা তুলে ধরলো আর ঘরে উপস্থিত সব মহিলারা পালা করে সেটা পরীক্ষা করতে শুরু করলো আর শোনাতে লাগলো মত আর মন্তব্য।
‘আরে, বিবি, পেট এখনই ছেড়ে দিও না, খুব রক্তপাত হচ্ছে। ওকে শক্ত করে ধরে থাকো,’ ধাই বলল। আর আইশা বেগম গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে পেট চেপে রাখলো।

‘আমি এখন নাড়ি কাটবো। রক্তপাত শীগগির বন্ধ হয়ে যাবে’, ধাই আর একবার নাড়িটা তার পায়ের আঙুলের মধ্যে ধরলো আর মৃদু ভাবে টানতে থাকলো। তখন, বিছানার পাশে পড়ে থাকা সেলাইয়ের সুতো নিয়ে সে নাড়ি বেঁধে ফেললো। চারিদিকে আর একবার তাকিয়ে, সে একটি মরচে পড়া কাঁচি মাটি থেকে তুলে সেটি পরিষ্কার করলো। রক্তপাত কমে যাওয়ার কোন চিহ্ন দেখা গেল না। এক বিজয়ীর মত সে মাসি উঠে দাঁড়ালো। পায়ের উপর থিতু হল আর তখন দেহ এগিয়ে সে বলল, ‘আরে হায়, তুমি সরে যাও, বড়ি বেগম, তুমি ওকে তুলতে পারবে না। সাবিরা বেবি, তুমি আর কাইজার—তোমরা সাহায্য করতে এগিয়ে এসো।’
সাবিরা আর কাইজার কুবরা’র দেহের নীচে হাত গলিয়ে দিল আর, তার প্রতিবাদের চিৎকারে কান না দিয়ে তাকে কোমরের উপর আট ইঞ্চি তুলে ধরল। আর তখন মাসি এক গজ লম্বা কাপড় দিয়ে তার তলপেটের চারিদিকে জড়াতে শুরু করলো। রক্তপাত কিছুটা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু, ইতিমধ্যে কুবরা যেন ধোয়া কাগজের মত সাদা হয়ে গেছে। তাকে খড়কুটোর মত ভঙ্গুর দেখাচ্ছে। শিশুর প্রসব হল, নাড়ি বের হল, আর আল্লা যদি তার করুণার জন্য থেকে থাকেন তবে তার শরীরে শক্তি আবার ফিরে আসবে।
দীর্ঘ অবকাশের পরে আসিফ জাহান শিশুর দিকে মুখ ঘোরালো আর তার দিকে এক দৃষ্টি তাকিয়ে মন্তব্য করলো, ‘রঙ কালো হয়েছে।’
‘আরে, এটা কি রঙের বিচারের সময়? সে পিচ-কালো হলেও কি আমি তাকে পরিত্যাগ করতে পারবো? আরে, মাসি, তুমি শিশুকে স্নান করাবে কি না?’
মাসি শিশুকে স্নান করালো। আসিফ জাহান ছোট্ট শিশুকে ধরতে চাইলেও সে তাকে দিতে অস্বীকার করলো। ‘বিবি, এই শিশুকন্যা অনেক প্রার্থনার ফসল। এমনি এমনি আমি তোমার হাতে শিশুকে দেবো না। প্রথমে আমার হক আমাকে বুঝে নিতে দাও।’
‘আরে, কী নতুন কায়দা এখন শুরু করলে? তুমি যে কুণ্ডাতে নাড়ি ফেলেছো সেই পাত্রে আমি আগেই তোমার পাওনা রেখে দিয়েছি।’
আগ্রহের সঙ্গে বড় মুখে হেসে মাসি জিজ্ঞেস করল, ‘আল্লার নামে বল, কত…?’
‘আবার কত… পাঁচ টাকা?’
‘বড়ি বেগম, আমি কখনো পাঁচ টাকা মেনে নেবো না!’
‘তুমি কি পাগল হয়ে গেছো, মাসি? জন্মের সময় বিয়ে স্থির হলে লোকেরা নাড়িরাখা কুণ্ডায় এক টাকা রাখে। এইটা কি উপহার দেবার সময়? বিয়ে যখন হবে তখন তোমার খুশিমতো নিও।’
‘হ্যাঁ, বিবি, ঠিকই বলেছ। ওর বিয়ের সময় আমি বেঁচে থাকবো, তাই না? তোমাদের মত মহিলারা লাখ লাখ টাকা খরচ করার সময় দুবার ভাবো না, কিন্তু কারুর হকের টাকা দেবার সময় এলে তোমরা ফক্কিবাজি শুরু করো আর রীতিনীতির কথা শোনাও। ধাঙ্গর তার টাকা বুঝে নেবে, মালির মেয়ে গুলসাবু তারটা পাবে, প্রত্যেকে নিজেরটা পাবে। বিবি, আমি তোমাকে বলছি, আমি এই পাঁচ টাকায় ভুলছি না।’
মাসি হল পারিবারিক ধাই। প্রায় সবারই জন্মের সময় সে উপস্থিত থেকেছে। সে জানে যে সে হকের টাকা লড়াই করে নেবেই। আসিফ জাহান টাকার থলি খুলল আর কুণ্ডার মধ্যে রাখার নাভিরজ্জুর ওপরে আরো দুটাকা ছুঁড়ে দিল। যখন মাসি পাঁচ টাকার আশায় আছে তখন সে কি আর দুটাকা মেনে নেয়? তবুও সে টাকা ধুয়ে নিল আর নিজের কোচরে গুঁজে নিল। ঘরে জড় হওয়া সব মহিলাই মাসিকে কিছু না কিছু দিলঃ কেউ আট আনা, কেউ এক টাকা। মাসি কুণ্ডা তুলল আর কুবরাকে বলল, ‘দুলহন, আমি তোমাকে বলছি, অনেক প্রার্থনা আর আবেদনের পরে পাওয়া এই কন্যা পুত্রের অধিক। আমি শপথ করছি, আমি সোনার বালা ছাড়া কিছু নেবো না।’
‘আরে, বাঃ, কুবরা কখন কন্যার জন্য প্রার্থনা করেছিল? তুমি যা চাও তা মুমামিজানের কাছে থেকে নিও। সেই একমাত্র কনার জন্য প্রার্থনা করেছিল। এই পরিবারে অন্য শিশু জন্মানোর সময় তোমাকে যা দিয়েছি এইবারও তোমাকে তাই দেবো,’ আইশা বেগম উত্তরে বলল।
‘
মাসি আসিফ জাহানকে শুনিয়ে বলল, ‘বড়ি বেগম, তুমি শুনেছো?
আইশা বেগম বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আরে বাবা, মাসি, তুমি কেন এখন চলে যাচ্ছো না। যাও, পরিষ্কার হও আর দুয়েক খিলি পান খাও। তুমি কি “দাও-দাও” ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারো না?’
সবাই জানে আইশা বেগম খুব চাঁচাছোলা কথা বলে। নিজের বোনকে কিছুটা ধাতস্থ করার পরে সে ডোমনিদের ডেকে পাঠিয়েছে। এই পেশাদাররা উৎসবের সময়ে গান গাইতে আসে। যে বাড়িতে এতক্ষণ ধরে হৈ চৈ চলছিল, তা এখন ড্রাম আর গানের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠলো। সমস্ত রকম হাসিঠাট্টার মধ্যে কেউ আর ভেবে দেখলো না যে সদ্য শিশু প্রসব করা মহিলাটির ঘুম আর আরামের প্রয়োজন।
সমস্ত মহিলারা নিজেদের মধ্যে মজা করতে আর আসিফ জাহানকে উত্যক্ত করতে লাগলো। ডোমনিরা একগুচ্ছ গান শুনিয়ে দিলেঃ যাচ্ছাগিরি, সুহাগ, গালিয়াঁ। পেট নাচিয়ে নাচিয়ে তারা প্রসূতিঘরের দৃশ্য অভিনয় করে দেখালো। ‘আইজী, এটা কী মাস?’ সেই মেয়েটা বললো যে স্বামীর অভিনয় করছিল। আর অন্যজন যাকে মনে হচ্ছিল স্ত্রী সে উত্তর দিল, “সাত” বা “আট”। শিশুপ্রসবের সময় যে সব অবিবাহিত মেয়েদের আঙ্গিনার একধারে আটকে রাখা হয়েছিল, তারা এবার সবাই স্বাধীন ভাবে ঘুরতে থাকলো। কয়েকজন তরুণ ছেলেও মহিলামহলের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। বারো বছর বয়সি বর সেই বালকদলের মধ্যে ছিল। সে পিছন থেকে উঁচু হয়ে উঁকি মেরে সব মজা ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিল। হঠাৎ, তার থেকে বয়সে বড় এক সম্পর্কিত বোন তাকে ধরে ফেলল। ‘এদিকে দেখো, সব্বাই, বরকে ধরে ফেলেছি!’
হাসির লহর বয়ে গেল।
বর কবল থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা করছিল আর বন্দিকারীর আছে অনুনয় করছিল, ‘বা জী, দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও…।’ আর যখন সে পুরুষমহলের দিকে পালানোর চেষ্টা করছিল, তার সম্পর্কিত বোন তার পিছন পিছন জোরে চিৎকার করতে লাগলো, ‘আরে, কেমন বর তুই? ভিতরে আয়, আয় আর দেখ কেমন চাঁদের মত কনে পেয়েছিস তুই!’
