ওরা দুজন ছোট থেকে কেউ কাউকে চিনত না, বা কারো সম্বন্ধে কেউ কিছু জানতোও না। হঠাৎ করেই কলেজে নবীন বরণের দিন দুজন দুজনকে প্রথম দেখে আর সেই প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলে দুজন দুজনকে। এ যেন বিধাতার এক পূর্বপরিকল্পিত মিলন। দুজনের প্রতি দুজনের অটুট বিশ্বাস। রুপে- গুণেও যেন ওরা অতুলনীয়। ঠিক যেন রাজযোটক। এই জগতে ওদের জুড়ি মেলা ভার।
ওদের চলাফেরা-ওঠাবসা সব যেন ছন্দে-তালে-সুরে বাঁধা। একটু কথা কাটাকাটি, সামান্য খুনসুটি হয়েই থাকে, তবে তেমন কিছু নয়।
দুজনেই চেষ্টা করে দুজনকে কোনরকম কষ্ট বা আঘাত না দেওয়ার। একে অপরের পরিপূরক হয়ে যে যখন যাকে পারে, শুধু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এমনি করেই পায়ে পা মিলিয়ে হাতে হাত রেখে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ওরা জয় করে হেসেখেলে। পারিজাত আর সৌরভ পরম দুই বন্ধু। পারিজাত সব সময় হেসে কথা বলে ওকে দেখলে মনে হয় যেন ফুলের মতো নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক আর ফুলের মতোই হাসির ঝরনা ধারায় ভরিয়ে দেয় এ বিশ্বভুবন। সৌরভের সৌরভ তো যেন পৃথিবীর সব আনাচে-কানাচে পৌঁছে যায়। ওদের দেখলেই বোঝা যায় ভালোবাসা কতো সুন্দর কতো পবিত্র।
ভালোবাসার যা ধর্ম ওরা দুজনেই দুজনের পছন্দ-অপছন্দ সবটাই জেনে নিয়েছে খুব অল্প সময়ে। কে যে বেশি ভালবাসে সেটা ওরা বুঝেই উঠতে পারে না। পারিজাত খুব সহজ সরল এবং আত্মভোলা। পারিজাতের ওসব নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই। পারিজাত বলে ভালোবাসা তো ভালোবাসাই তার আবার কমবেশি হয় নাকি? সৌরভ একটু নাছোড়বান্দা। সৌরভের সব সময় জানতে ইচ্ছে করে কে বেশি ভালোবাসে? এতো ভালোবাসা পেয়েও সৌরভের মনে কোথায় যেন একটা দ্বন্দ্ব থেকে যায়। সৌরভ সব সময় ভাবে সেই বোধহয় বেশি ভালোবাসে পারিজাতকে।

এভাবেই চলতে চলতে একদিন সৌরভ জানতে পারে ভালোবাসা পরিমাপ করবার অর্থাৎ কে কতটা ভালোবাসে সেটা মাপবার একটা যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। কে কতটা ভালোবাসে সেই যন্ত্র সবটাই বলে দেয়। সে যন্ত্র একেবারেই মিথ্যা বলে না। তার গণনা নির্ভুল।

অনেক খোঁজখবর নিয়ে সৌরভ সেই যন্ত্রে তাদের ভালোবাসা মাপতে যাবার কথা পারিজাতকে বলে। পারিজাত কিছুতেই রাজি হয় না। পারিজাত বলে এও কি সম্ভব? ভালোবাসা কখনো মাপা যায়? অনেক তর্ক বিতর্কের পর পারিজাত সৌরভের সঙ্গে যেতে রাজি হয়। বেশ কিছু টাকা পয়সা খরচা করে সেই যন্ত্রে তারা দুইজন ভালবাসা মাপতে যায়।
পরীক্ষার আগে দুজন দুজনকে ভালো করে একবার দেখে নেয়। দুজনেরই হৃদযন্ত্র ধুকপুক ধুকপুক করছে। পরিশেষে সেই কাজটিও সুসম্পন্ন হয়। প্রতীক্ষা শুধু রেজাল্টের। এক সময় তাদের রিপোর্ট তাদের হাতে এসে পৌঁছোয়। পারিজাত বলতে থাকে আমি আগেই বলেছিলাম এসব করবার কোনো দরকার নেই, তুই শুধু শুধু এলি।
রিপোর্ট এসেছে পারিজাতের ভালোবাসার মান হান্ড্রেট পার্সেন্ট অর্থাৎ ১০০ ভাগ। কে জানে এমনটা হয় কিনা! অন্যদিকে সৌরভের ভালোবাসার মান ৭৫ শতাংশ।
রাগে-দুঃখে সৌরভ যখন ওদের ভালোবাসার মানপত্র ছিঁড়ে ফেলতে গেল হঠাৎই‌ কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল তার।

ঠিক সেই সময় সৌরভের মা তাকে বেড টি দিতে গেছে। ছেলেকে একটু অন্যরকম দেখে বলল, হ্যাঁরে কিছু হয়েছে নাকি, কোনো দুঃস্বপ্ন দেখলি? সৌরভ বললো না মা ও কিছু নয়।

মা চলে যেতেই সৌরভ মনে মনে বললো কোনো বিজ্ঞানী এই ভালোবাসা পরিমাপের কোনো যন্ত্র কোনদিনও যেন আবিষ্কার না করেন। বলেই হাফ ছাড়লো, ভাগ্যিস এটা স্বপ্ন ছিলো।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]