
শুচি
গাঢ় কদমের বড় বড় পাতায় তোরণ আচ্ছন্ন। আষাঢ় মাস আসন্ন, গোলাকার ফুলের বার্তায় কদম গাছ ছেয়ে আছে। গোপীবল্লভ মন্দিরের ছায়াঘন তপোবন আক্ষরিক অর্থেই শান্ত সমাহিত। বিশাল মন্দির চত্বর। শুধু মন্দির নয়, তার সঙ্গে রয়েছে নাটমন্দির বাগান, ক্ষেত, গোশালা, স্কুল, অতিথিশালা, ভোগ রান্নার আর বিশাল খাওয়ার ঘর। প্রাঙ্গনে প্রবেশের মুহূর্তেই মন ভালো হয়ে যায়। ভোর চারটের মঙ্গলারতির সময় থেকেই কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়ে যায়।
সকাল সাতটা নাগাদ জুবিলি প্রোডাকশান হাউসের গাড়িগুলো তপোবনের তোরণ পার করে পরপর ঢুকে দাঁড়ায়। একেবারে শেষের ধূসর রঙের এস-ইউ-ভি থেকে নেমে আসে ছবির নির্দেশক মুরারি মোহন। তাঁকে দেখে ধীরে ধীরে গোপীবল্লভ মন্দিরের বরিষ্ঠ মহন্ত চিদানন্দ স্বামী এগিয়ে আসেন। দীর্ঘদেহী সুঠাম চেহারার এই সন্ন্যাসীকে দেখে সকলেরই ভক্তির উদ্রেক হয়। মুরারি মোহন নিজের হাত জড়ো করে প্রতি নমস্কার করে। কয়েকজন এগিয়ে এসে সন্ন্যাসীর পা ছোঁয়। হাতে জপের থলি, বোঝা যায় নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মতো জপও ওর নিত্যসঙ্গী। থলিসুদ্ধ হাত কপালে ছুঁয়ে সকলের প্রণাম গ্রহণ করেন। তারপর খুব বিনীত গলায় বলেন, “হরে কৃষ্ণ, মুরারি বাবু। মন্দির প্রাঙ্গনে আপনাদের স্বাগত জানাই। একটা কথা আপনার সকল সদস্যদের জানিয়ে দেবেন, এই পবিত্র তপোবন ভূমি আমাদের কাছে বৃন্দবনসম। তাই সেই পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের।”
“নিশ্চয়ই।”
মহন্ত ডানদিকে একটা বড় সাইনবোর্ডের দিকে তাঁর তর্জনী নির্দেশ করেন। মুরারি লক্ষ করে সেখানে বাংলা, হিন্দি, ইংরাজি ছাড়াও আরও চার পাঁচটি বিদেশি ভাষায় তপোবনের নিয়মাবলী লেখা রয়েছে। সেদিকে একবার চোখ বুলিয়ে, প্রোডাকশন ম্যানেজার সৃঞ্জয়কে ডাকে।
চিদানন্দ স্বামী বলেন, “আপনাদের জন্য মহাপ্রসাদের ব্যবস্থা আছে। ক্যান্টিনে গিয়ে, আপনারা কতজন আছেন জানিয়ে দেবেন, তাহলেই হবে।” তারপর একটু থেমে বলেন, “ঠিক আছে, আপনারা কাজ শুরু করুন, প্রয়োজনে আমায় খবর দেবেন, আমি কাছাকাছিই থাকব। হরেকৃষ্ণ।” ধীরে ধীরে তিনি মন্দির সংলগ্ন ওঁর অফিসের দিকে চলে যান।
মহন্তর কথার মধ্যেই সৃঞ্জয় এসে উপস্থিত। বছর তিরিশের ছেলেটি অতি করিৎকর্মা। মুরারির সামনে এসে বলে, “আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। তপোবনে আউটডোর করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। এখানে মদ, মাংস থেকে বিড়ি, সিগারেট, তামাক দোক্তা সব নিষেধ। আমার কোন সমস্যা নেই। টেকনিশিয়ানদেরও বলে দেব, একস্ট্রারাও কথা শুনে চলবে। শুধু সমস্যা হবে সিনিয়ার আর্টিস্ট আর হিরো হিরোইনকে নিয়ে। দেখি কী করতে পারি?”

[Sourav Story on purity]
জুবিলি প্রোডাকশানের ব্যানারে বৈষ্ণব সাহিত্যের ওপর একটি ছবি তৈরি করছে মুরারি মোহন। সেই সূত্রেই তপোবনে আসা। আগে থেকে অনুমতি নেওয়া আছে, সেই অনুযায়ী আজ থেকে পরবর্তী পাঁচ দিনের আউটডোরের ঠিকানা, এই তপোবন।
সকলে কাজে লেগে পড়ে। অতিথিশালার একটি বাংলো ওদের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছে, সেখানে একটা ঘরে কস্টিউম, একটা ঘরে মেকাপের ব্যাবস্থা। সিনিয়ার আর্টিস্টদের জন্যেও আলাদা করা রয়েছে একটি ঘর। যার যার দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ শুরু করে। মন্মথ মহান্তী নিজেও কন্ঠীধারী বৈষ্ণব, গত পনেরো বছর ধরে জুবিলির কস্টিউমের দায়িত্বে রয়েছে। ব্যাগের ভেতর থেকে নিজের জপের থলি বার করে কপালে ছুঁয়ে গলায় ঝোলায়। মুরারি লক্ষ করে বলে, “তোমায় আগে তো জপ করতে দেখিনি।”
“পাপী হয়ে গেছি স্যার। এখানে মহারাজকে দেখে হুঁশ ফিরল।”
“বাহ! তাহলে, এখানে আউটডোর করতে আসায়, অন্য লাভও হয়েছে।”
“সব ভগবানের ইচ্ছে!” মন্মথ আরেকবার থলিটা কপালে ছোঁয়ায়।
মেকাপ আর্টিস্ট কদম মুর্শেদ বড় আয়নার সামনে তার সরঞ্জাম সাজাতে ব্যস্ত। সৃঞ্জয় এসে বলে, “কদম-দা, মন্দিরের নিয়মকানুন জানো তো?”
“হ্যাঁ রে বাবা! কেশ পেকে গেল এই ইন্ডাস্ট্রিতে। সেই কোনকালে মহাপ্রভু সিরিয়ালের কাজ করেছি। তার বেশিরভাগ শুটিংই তো এখানে। ক’দিন তোদের ওই গাদা তেল মশলা দেওয়া মাছ মাংস খেতে হবে না, এই ভালো। স্টমাক রেস্ট পাবে।”
সৃঞ্জয় ঘুরে ঘুরে সেট, লাইট, সাউন্ড, ক্যামেরা সব করিগরদের কাছে গিয়ে গিয়ে বলে এল, “ভাই, বিড়ি সিগারেট খেতে হলে, গেট-এর বাইরে গিয়ে খেও।”
একস্ট্রা-রা বেশিরভাগ এখানকার স্থানীয় মানুষ, ওরা তপোবনের নিয়ম সম্পর্কে অবহিত। একজন অল্পবয়সী মহারাজ, বিষ্ণুপদ স্বামী একটু দূর থেকে দলটাকে নজরে রাখছে। কানাইলাল এই ইউনিটের ডি-ও-পি, সিগারেট ছাড়া চলে না। সৃঞ্জয়কে দাবড়ে বলে, “দুনিয়ার লাথখোরদের চাষ এই ইন্ডাস্ট্রিতে, তাদের এখন ধরে ধরে কন্ঠীধারী বৈষ্ণব বানাতে চাইলে, হবে?”
“দুটো দিন, একটু কষ্ট করে চালাও দাদা।”
“কষ্টের কিছু নেই। তামাকের ধোঁয়া ছাড়া ছবি, সে রকমই হবে। তোর স্যারকে বলে দিস।”
সৃঞ্জয় হাসে, “স্যারও গেট-এর বাইরে গিয়ে রিচার্জ করছে। তুমিও ওঁর সাথে যেও।”
“ওরে ছবি তোলা বা আঁকা একটা আর্টফর্ম, একহাতে তুলি বা ক্যামেরা, আর অন্য হাতে সিগারেট। যা যা কাজে যা, আমায় ঘাঁটাস না।”

[Bengali short story on national integration]
সৃজন চলে আসে। মনে মনে ভাবতে থাকে, এদের তো তবু হাতে পায়ে ধরে কাজ চালাচ্ছে, পারমিতাকে কীভাবে ম্যানেজ করবে? কলটাইম আটটা বলা ছিল, দশটা বেজে গেল, এখনও পাত্তা নেই। শট প্ল্যানিংএ যেগুলো পরেরদিকে ছিল, সেগুলো এগিয়ে আনতে হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঠিক আটটা থেকে ক্যামেরা চালু হয়ে গেছে।
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সৃঞ্জয় চলেছে, তখন পথ আটকে দাঁড়ায় তরুণ সন্ন্যাসী বিষ্ণুপদ স্বামী, “হরেকৃষ্ণ, দু-মিনিট কথা বলা যাবে?”
তপোবনে এসে, সন্ন্যাসীদের এড়িয়ে চলার উপায় নেই। যদিও মাথার মধ্যে হাজারটা কাজের পতাকা উড়ছে, তা সত্বেও দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, “হ্যাঁ বলুন।”
“আপনার চোখে কিন্তু একটা বিশেষ উজ্জ্বলতা আছে।”
“মানে?”
“মানে, আপনার ওপর প্রভুর আশীর্বাদ রয়েছে।”
“তাই বুঝি? কিন্তু কাজের বেলায় তো টের পাই না। এই দেখুন দুঘন্টার বেশি হয়ে গেল, পারমিতার দেখা নেই, ডিরেক্টর এবার আমায় ঝাড়বে।”
“সেই জন্যই তো বলছি, আপনি এবার দীক্ষাটা নিয়ে নিন। সামনেই স্নানযাত্রার শুভদিন আছে।”
“কী?” সৃঞ্জয় আকাশ থেকে পড়ে। এই প্রোডাকশানের একশ মানুষের হাজার বায়নাক্কার মধ্যে জড়িয়ে পেঁচিয়ে থেকে, দীক্ষা শব্দটা ওর কাছে যেন বহির্বিশ্ব থেকে ছুটে আসা কোন গ্রহাণু টুকরোর থেকেও বেশি আকস্মিক অপরিকল্পিত কিছু।
“দেখুন দীক্ষা নিলে, মন্ত্র পাবেন। জপ করার থলি পাবেন। গলায় মালা নিতে পারবেন, কপালে রসকলি পাবেন। কী ভালো লাগবে, তাইনা?”
সঞ্জয় বলে, “আমি চাইলেই তো এখুনি কদমদা আমায় এমন ভাবে সাজিয়ে দিতে পারবে, তার জন্য দীক্ষা নিতে হবে কেন?”
“কদম দা?”
“আমাদের মেকাপ আর্টিস্ট।”
“ও! সে তো সত্যি নয়, সব নকল।”
“আসল নকল ফারাক করতে পারবেন না।”
“দেখুন এখন আপনাকে দেখে বোঝাই যায় না, আপনি মুসলমান না হিন্দু? গলায় কন্ঠী নেই, মাথায় শিখা নেই, হাতে তাগা নেই।”
“দেখে, মানুষ বলে বোঝা যায় তো? আশীর্বাদ করুন যেন সেটুকু বজায় থাকে, তাহলেই হবে।”
ঠিক সেই সময়, চিদানন্দ স্বামী ওখান দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন, তরুণ সন্ন্যাসী আর সৃঞ্জয়ের কথা শুনে বলেন, “বিষ্ণু মহারাজ ওঁকে ছেড়ে দিন। ওঁরা ওই শুট্যিংএর কাজে এসেছেন। যেদিন ভক্ত হয়ে আসবেন, সেদিন বলবেন। আজ ওঁর ফিল্টার লাগানো রয়েছে, আপনার কথা অন্য অর্থ করবে।”
বড় মহন্তর কথা শুনে, তরুণ সন্ন্যাসীটি বিদায়ী ‘হরেকৃষ্ণ’ বলে মন্দিরের দিকে এগিয়ে যায়।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরে ভক্ত সমাগম বাড়ছে। তবে শুট্যিংএর কারণে কৌতুহলী মানুষ সেট-এর কাছাকাছি আসতে চাইছে। মন্দির কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই ব্যবস্থা করেছে। আভ্যন্তরীণ প্রহরী ছাড়াও আজ স্থানীয় থানা থেকে অতিরিক্ত পাহারার ব্যবস্থা করেছে।
ঠিক তখন তপোবনের বড় তোরণ দিয়ে কালো দামী একটা গাড়ি ঢুকতে দেখা যায়। সৃঞ্জয় গাড়িটা চেনে, পারমিতা ম্যাম। ওদের এই ছবির নায়িকা। একছুটে গাড়ির সামনে। প্রথমে দরজা খুলে নেমে আসে পারমিতার ব্যক্তিগত হেয়ার ড্রেসার নমিতা। অতপরঃ এখনকার উঠতি নায়িকা পারমিতা। ছেঁড়া জিনস আর পেট বার করা ছোট টপ। সৃঞ্জয় দেখেই চমকে ওঠে, এই ভক্তিমাখা পরিবেশে এমন অবতার! তবে আশার কথা, কিছুক্ষণের মধ্যেই কস্টিউম আর মেকাপ-এ পরামিতা ‘রাধারাণী’ হয়ে যাবে। পার্কিং থেকে একটা বড় ছাতায় আড়াল করে দ্রুত পারমিতাকে নিয়ে নির্দিষ্ট বাংলোতে ঢুকে পড়ে। তার মধ্যে কয়েকজন ভক্ত মন্দিরের প্রতিমার চেয়ে পারমিতা দর্শনে উৎসাহী হয়ে পড়লে, প্রহরীরা তাদের সরিয়ে দেয়।
ঘন্টা দুয়েক পর যখন রাধারাণীর বেশ নিয়ে মন্দির প্রাঙ্গনে পারমিতা পৌঁছয়, তখন সৃঞ্জয়ও খানিক হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। নমিতার সঙ্গে কদমদা নিজেই সেট-এ এসেছে, যাতে শট চলাকালীন মেকাপ বা চুল ঠিক করে দেওয়া যায়। মুরারি মোহন স্ক্রিপ্ট নিয়ে শটের আগে আলোচনা করে নিচ্ছে। সৃঞ্জয় দুজন একস্ট্রাকে কিছু নির্দেশ দেওয়ার জন্য সেট-এ পারমিতার কাছে যেতেই, গন্ধটা ঝপ করে অনুভব করে। এই সকালবেলাতেই পারমিতা মদ খেয়ে রয়েছে। মন্দিরের ভেতরে গর্ভগৃহের এত কাছে, সৃঞ্জয়ের ভালো লাগে না। এখুনি কোন সন্ন্যাসী যদি কাছাকাছি আসে, কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। শুচিতা অবমাননার কারণে ওদের পুরো টিমটাকে এখনই দূর করে দিতে পারে, সঙ্গে জরিমানা বা আরও অনেক কিছু।
পিছিয়ে এসে মুরারি মোহনকে ডেকে আশঙ্কার কথা বলে। শুনে মুরারির মুখ শুকিয়ে যায়, “কী করব? ক্যানসেল করে দেব? এই কারণে ক্যানসেল করছি জানলে, ও আর কোন ডেট দেবে? আমার পুরো প্রজেক্ট চটকে যাবে।”
“তাহলে?”
“তুমি দেখো, যাতে মহন্তরা কেউ এদিকে না আসে।”
“ওঁদের মন্দির, সেখানে ওঁদের আটকানো কি আমার এক্তিয়ারে পড়ে?”
“জানি না। যা হবার হবে। এত কান্ড করে এখানে এসে, আমি শুট না করে যাব না।”
ওদিকে ‘রাধারাণী’ সেট-এ এসেছে শুনে অনেকেই এসে জড়ো হয়েছে। যদিও একটা দড়ির বেষ্টনী দিয়ে সকলকে আটকে রাখা আছে, তবু সেখান থেকেই সকলে হাত ওপরে তুলে ‘রাধে রাধে’ ধ্বনিতে নাটমন্দির ভরিয়ে তুলছে। এই শোরগোলের ভেতর বড় মহন্তর সঙ্গে সেই অল্প বয়সী বিষ্ণুপদ স্বামীকে আসতে দেখা যায়। সৃঞ্জয় অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যায়। সাধারণ ভক্তদের আটকানো দড়ির বলয় পার করে, ওরা ধীরে ধীরে সেট-এর দিকে এগোয়। সেখানে মন্মথকে একমনে জপ করতে দেখে বিষ্ণুপদ স্বামী দাঁড়িয়ে পড়ে, “আপনি কি অভিনয়ে করছেন?”
মন্মথ অবাক হয়ে বলে, “বুঝলাম না।”
সৃঞ্জয় এগিয়ে এসে বলে, “মহারাজ, উনি আমাদের কস্টিউম ড্রেসার। আর উনি সত্যি সত্যিই পরম বৈষ্ণব। পুরীতে ওঁদের আদি বাড়ি।”
শুনে দুই সন্ন্যাসীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, জপের থলি কপালে ছুঁয়ে এক সঙ্গে বলে ওঠেন “হরে কৃষ্ণ।”
মন্মথও নিজের জপের থলি মাথায় ছুঁয়ে উত্তর দেয়।
ততক্ষণে প্রথম কয়েকটা শট নেওয়া হয়ে গিয়েছে। সৃঞ্জয় বুঝতে পারে, মুরারির চোখেমুখে বেশ নিশ্চিন্ত ভাব। সেটের ভেতর বেশ কয়েকজন একস্ট্রা সাধারণ বেশভুষা পরে আছে। সকলের গলায় কন্ঠী, কপালে তিলক।
সাধুরা হাঁটতে হাঁটতে ওদের কাছাকাছি পৌঁছয়। বিষ্ণুপদ স্বামী বলেন, “এঁরা তাহলে সকলেই ভক্ত?”
মুরারি এগিয়ে এসে বলে, “ভক্ত তো বটেই, তবে সিনামায়। এঁরা প্রত্যেকেই অভিনেতা, ভক্তের রোল করছেন।”
এবার সন্ন্যাসী দুজন হেসে ওঠেন। বড় মহন্ত বলেন, “বুঝলে, মায়া আর ছায়ার জগত মিলে মিশে এক হয়ে গেছে।”

[Sourav Story on religion]
পারমিতা একটা চেয়ারে বসে। ওকে ঘিরে নিজস্ব হেয়ার ড্রেসার আর কদম মুর্শেদ, পরের শটের জন্য প্রস্তুত করছে। সন্ন্যাসী দুজন আর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে না। মুরারি দূর থেকে বলে, “পারমিতা, মহারাজরা তাঁদের রাধারাণীকে দেখতে এসেছেন।”
পারমিতা ওখান থেকেই হাত জড়ো করে নমস্কার জানায়, “প্রণাম মহারাজ।”
প্রত্যুত্তরে দুজনে “হরে কৃষ্ণ” বলেন।
বিষ্ণুপদ স্বামী বলেন, “এরপর থেকে নাট মন্দিরে অনুমতি দেবেন না।”
চিদানন্দ স্বামী অবাক হয়ে তাকান, “কেন বল তো?”
“কত রকম লোকজন আসেন, শুচিতা নষ্ট হয়।”
“প্রভু কি শুধুমাত্র শুচিগ্রস্তদের? তাঁর কাছে কোন ভেদাভেদ নেই। তাছাড়া এ ছবি তো রাধারাণীকে নিয়ে।”
দুটো শটের মাঝে একটু ফাঁক পেয়ে অধিকাংশ টেকনিশিয়ান বাইরে গিয়েছে ধূমপান করতে। নির্দেশক মুরারি, ডি-ও-পি কানাইলাল, তারাও নেই। মেকাপ শেষ করে কদম কাঁধে মেকাপের বাক্স, তোয়ালে নিয়ে এগিয়ে আসছে। বিষ্ণুপদ স্বামী একটু রহস্য করে বলেন, “এবার কি ধূমপান করতে যাচ্ছেন?”
কদম হেসে বলে, “আমার কোন নেশা নাই। আমি মাছ মাংসও খাই না।”
শুনে বিষ্ণুপদ স্বামীর চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, “তাই তো আপনার চোখে একটা আলাদা জ্যোতি লক্ষ্য করলাম।”
সৃঞ্জয় দূর থেকে নজর রাখছিল। এইবার ওকে অন্য একটা ভয় পেয়ে বসে, যা পারমিতার নেশার গন্ধ প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর। কদমদার পুরো নাম জানলে মহারাজ কী করবেন ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে।
বিষ্ণুপদ স্বামী তখন কদমকে বলেছেন, “আপনি কি জন্ম থেকে নিরামিষ খান?”
“না না আমাদের বাড়িতে নিরামিষের চল নেই। বছর দশেক হল, আমি নিজে থেকেই ছেড়ে দিয়েছি।”
“হরে কৃষ্ণ, তবে কি আপনার দীক্ষা হয়ে গিয়েছে?”
সৃঞ্জয় এটাই অনুমান করছিল। দ্রুত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট করতে চিদানন্দ স্বামীর কাছে এসে, ওকে ডাকে। বড় মহন্ত একটু এগিয়ে গিয়েছিলেন, ডাক শুনে বিষ্ণুপদ আর কদমের কাছে আসেন।
তখন কদম বলছে, “আমাদের মধ্যে দীক্ষার ব্যাপারটা সে ভাবে নেই।”
বিষ্ণুপদ স্বামী বলেন, “আপনাদের মানে?”
“আমার নাম সৈয়দ কদম মুর্শেদ।”
বিষ্ণুপদর মুখ তখন দেখার মতো। নাটমন্দিরের ঘেরাটোপে একজন বিধর্মী! ওঁর শুচিতার পাহাড়ের যেন ভেঙে পড়ার শব্দ পাওয়া গেল। ততক্ষণে চিদানন্দ স্বামী পুরোটা অনুধাবন করে ফেলেছেন। এগিয়ে এসে কদমকে জড়িয়ে বলেন, “আপনি আমার প্রভু হরিদাস। আপনার জন্য সব দ্বার খোলা।”
তারপর বিষ্ণুপদ স্বামীর দিকে ফিরে বলেন, “সন্তানরা নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ করলেও, সৃষ্টি কর্তার কাছে সব সন্তান সমান।” তারপর সকলের দিকে তাকিয়ে আবার বিষ্ণুপদ স্বামীকে বলেন, “চলে এসো বিষ্ণু, ওঁদেরকে কাজ করতে দাও।”

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারি ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
খুব ভালো গল্প l
অনেক ধন্যবাদ
খুব ভালো লাগলো গল্প। তোমার গল্পের টান দারুন।
যখন ভাবছিলাম, সব ক্যান্সেল হয়ে যাবে, সবাই কে তাড়িয়ে দেওয়া হবে, তখনই চিদানন্দ স্বামী, মুর্শেদ কে বুকে জড়িয়ে ধরলেন! দারুন! অভিনন্দন!
অনেক ধন্যবাদ।