
ঔরসজাত
১
দুজনে হাত ধরাধরি করে হাঁটছিল সুতপা ও সৌম্য। ঠিক যেন সদ্যবিবাহিত। অবশ্য সবে তো দু’বছর হল,’সদ্য’ই বটে। বিয়ের পর সেই যে একবার পাহাড়ে গিয়েছিল তারপর আর কাজের চাপে তেমন কোথাও যাওয়া হয় নি। টাকী ঘরের কাছে বেশ সুন্দর ছোট ছুটি কাটানোর ডেস্টিনেশান। নৃপেন্দ্র অতিথিশালা থেকে হাঁটতে হাঁটতে পড়ন্ত বিকেলে তারা এসে দাঁড়াল টাকির ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন “পুকুর পাড়ের জোড়া শিবমন্দির” এর সামনে। ঢলঢলে কাজল-নয়না দীঘির জলে মন্দির-যুগলের প্রতিফলন মুগ্ধ করে সুতপাকে। ইস, একটা যদি DSLR ক্যামেরা থাকত! এবারের মতো মোবাইল ক্যামেরাতেই ছবি তোলে ক’টি। কপালে আদর এঁকে সৌম্য বলে –” পরের বার এই দীঘির জলে তোমার reflection-এর একটা ছবি তুলবো আমি— দেখে নিও আমার তোলা সেরা ছবি হবে সেটি।“ প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজের মাঝে শখে ফটো তোলে সৌম্য। DSLR টা এখনও কেনা হয়ে ওঠে নি। তাই ছোট একটা ক্যামেরা নিয়েই বেরিয়ে পড়ে। অতিথিশালার ম্যানেজার বলেছিলেন –” একবার বিজয়া দশমীর দিন বিসর্জনের সময়ে আসবেন দিদি। তখন ইছামতীর অন্য রূপ– প্রাইভেট নৌকায় ঘুরিয়ে দেব।” আবার আসা হয়েছিল টাকীতে। কিন্তু…

২
আট বছর পর… বিজয়া দশমী। সুতপার মনটা কেঁদে ওঠে খুব। প্রতিবার সিদুঁর খেলতে যাওয়ার সময়ে মুখটা যেন রাঙিয়ে দিত সৌম্য। আগের বারও সে এই কাজ করেই বেরিয়েছিল….ইছামতীতে বিসর্জনের কিছু বিশেষ মূহুর্ত নতুন লেন্সের DSLR-এ বন্দী করবে বলে। এবার আর সেই “সৌম্য”-কান্তি হাতজোড়া নেই সুতপার সিঁথি রাঙানোর জন্য। আগের বছর ছবি তুলতে যাওয়ার দুদিন পরে সৌম্যর দেহটা ভেসে উঠেছিল বিদ্যাধরীর মোহনার কাছে। ওখানে অবশ্য বিসর্জনের দিন এই ঘটনা প্রায়ই হয়। কোনও কারণ ছাড়াই এবার আবার সিঁদুর খেলতে ইচ্ছা করছে খুব। জোরে ঢাকের আওয়াজ বাইরে। এই সময়ে টুবলু এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে “মা, ঠাকুর যাচ্ছে, এস….” ছেলের হাত ধরে সদর দরজায় আসে সুতপা। অবাক দৃষ্টি মায়ের সিঁদুর-লেপা কপালে….”আবার এসো, মা”। সেই DSLR ক্যামেরা…. যা দিয়ে সৌম্য একদিন তার সেরা ছবিটি তুলবে ভেবেছিল…সৌম্যর দেহটি পাওয়া গেলেও, ওটি আর পাওয়া যায় নি। সব কিছু তো একজন্মে হয় না…সেরা ছবিটা না হয় পরের জন্মে হবে। ইছামতী যে চিরতরে নিয়ে নিল তার সৌম্যকে…

৩
আজ সুতপা প্রৌঢ়া। চোখে চশমা। সামান্য পৃথুলা। চুলে পাক ধরেছে বেশ। জানুয়ারির এক পৌষ সকালে সূর্যোদয়ের অকৃত্রিম শোভা তার চোখের সামনে। এখানে আর আসতে চায়নি সে.. আঘাত করতে চায় নি সেই নির্মম স্মৃতিপটকে। কিন্তু তাকে এখানে আজ জোর করে নিয়ে এসেছে টুবলু, মানে সৌমাভ। তাদের একমাত্র সন্তান। তারই সঙ্গে ইছামতীর ডাকে আবার ছুটে এসেছে সুতপা। ইছামতীর বুকে সূর্যোদয় দেখে এসে দাঁড়িয়েছে সেই জোড়া শিব মন্দিরের সামনে। দীঘির সেই ‘হৃদয়হরণ’ টলটলে জল এখনো আছে…কিন্তু কে যেন নেই…সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে পিছল পুকুরঘাটে পা হড়কাল সুতপার। কিন্তু পড়ার আগেই কে যেন ধরে নিল এবং সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার ক্লিক-এর আওয়াজ। স্বনামধন্য ফটোগ্রাফার সৌমাভ বসুর হাত তখন তার মা সুতপা বসুর হাতে, অন্য হাতে DSLR-এর শাটার….মুখে হাসি যেন ‘বীরপুরুষ’ বলছে “আমি আছি, ভয় কেন মা কর”…

৪
কথা রেখেছিল সৌম্য, নিজে না পারুক… রেখেছিল তার ‘ঔরসজাত’। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় একাধিক বিভাগে পুরস্কার পায় সৌমাভর তোলা ঐ ছবিটি….আজ সুতপার ড্রয়িং রুমে স্বমহিমায়। নিখুঁত, ভয়ংকর সুন্দর। এক্ষুনি ফোন এসেছিল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে টুবলুর, দারুন বক্তৃতা হয়েছে তার ফটোগ্রাফি কনফারেন্সে। আজ এই পঁয়তাল্লিশতম বিবাহবার্ষিকীতে ঐ ছবির দিকে তাকিয়ে সুতপার স্বামী হারানোর সেই পাথর-চাপা দুঃখের অনুভূতিটা কেমন যেন আবছা হয়ে গেল। মন ভরে উঠল সন্তানের কৃতকর্মের আনন্দে। সৌমাভর মধ্যেই যে বেঁচে আছে তার সৌম্য….

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারি ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]