
সমাজে কবিরা উপদ্রবকারী
কবিতা কী? কীভাবে লেখা হয় একটি কবিতা? দুনিয়া জুড়ে সব ভাষাতেই কিছু লোক, আঙুলে গোণা কিছু লোক, কেন কবিতা লেখে? সহজ সহজ এসব প্রশ্নের কোনও সরল জবাব নেই। কবিরাই এসব প্রশ্নের নানাবিধ উত্তর দিয়েছেন, নিজের নিজের অবস্থানে, ভঙ্গীতে, আপনভাবনায়, তবু সে সকল ভাবনারাশি কাব্যপ্রয়াসের ক্ষেত্রে সহায়ক, কিন্তু সর্বসিদ্ধ নয়। সাহিত্যের সকল মাধ্যমের শীর্ষে কবিতা, সেই শীর্ষ কুয়াশাচ্ছন্ন, হয়ত তা কুহকের। কবিতা আকস্মিকের খেলা, অনিশ্চয়তার শিল্প। লিখে লিখে, নাকি বুনে বুনে, খুদে খুদে তৈয়ার হয় কবিতা? জানি না, জানি না, জানি না।
তবে কিনা এ-ই হল গিয়ে আমার মত, অন্য কেউ অন্য মত জানাবেন। কবিতাক্ষেত্র এইরকমই কলরবময়। এই দুনিয়ায় কবিরা নানাভাবে উপদ্রবকারী। কীসের কলরব! কোথায় উপদ্রব!- তবে যে বলা হয়, কত না কবি নিভৃতচারী, নির্জন, আবছায়াটি? বেশ,তাহলে ‘নির্জনতম’ জীবনানন্দকেই ধরুন। তাঁর চারপাশে তখন কারা, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু। মাথার ওপরে তখনও বহাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারায় ভরা আকাশতলে আমাদের জীবনানন্দ দাশ বলে দিলেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি! – কলরব নয়? উপদ্রব নয়?

কবিতা লেখার চেষ্টা করা, অর্থাৎ কবিতা প্রয়াস সামাজিকভাবে একটি অস্বাভাবিক কাজ। সমাজজীবনে কবিরা উপদ্রবকারী, সমাজের অভ্যন্তরে থাকা একজন আলগা মানুষ। উপেক্ষা, আক্রমণ,অপমান-এসব ঠেলে ফেলে তাঁরা জ্বল জ্বল করেন। জনপ্রিয়তা নয়, যথাকালে সমাজ তাঁদের মান্যতা দেয়। সমাজজীবনে দুর্ঘট ঘটিয়ে দেয় কবিরা। ধর্মগ্রন্থগুলি কবিতারই বই, কাব্যগ্রন্থ সকল।- এ-ই আমার ভাবনা, যার উল্টোটাও ভাবতে পারেন কেউ। এসব কথা লিখছি এই আসন্ন বিশ্ব কবিতা দিবসটিকে মাথায় রেখে। চলতি রীতিতে এখন যেমন সারা বছরটিতে একটি দিন জননীদিবস, একটি দিন ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ দিন নির্দিষ্টভাবে ঘোষিত এবং নানাভাবে পালিতও হচ্ছে, কবিতার জন্যও ২১ মার্চ দিনটি ধার্য হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেই এই দিনটি পালিত হবে, হয়ত দেশে দেশে কবিতা নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান হবে। নিশ্চিতই কবিতার প্রতি এ হল যারা এই সব দিবসের ডাক দেন, সেই বিশ্বকর্তৃপক্ষের, কুর্নিশ। এই মর্যাদাদানে আমরা, আমরা যারা এই দুনিয়ার কোণে কোণে বসে কবিতা লেখার চেষ্টা করি, তারা তো খুশি হবই। তবে কিনা কবিতা সারা বছরের। সারা জীবনেরও। কবিতা মহাবিশ্বময়। বিশেষ এই দিনটিতে নিশ্চয় এ বাংলায় কবিতা নিয়ে নানা অনুষ্ঠান হবে। আমি কোথায় যেন দেখলাম, ওইদিন ভোরবেলা মেদিনীপুর শহরের তরুণ কবিরা শহরে একটি কবিতা মিছিল করবে। ভোটের মুখে ওই রঙিন মিছিল চমকপ্রদ হবে। কারও কারও নিশ্চয় মনে হবে, এই তো প্রকৃত মিছিল, মানুষের মর্মস্থল থেকে জাগরিত মিছিল।
সে কীসের ছোঁয়া পাওয়া? চৈত্রদগ্ধ দুপুরে বা কনকনে শীতে ও কীসের হাওয়া? কারা কবিতা পড়েন, কবিতাপ্রয়াসীদের মতই তাঁরা ওই ছোঁয়া পাওয়া লোকজন, উছলা কিশোরী, উড়ন্ত তরুণ। মর্মগ্রহণে ক্ষমতাঅর্জনের ওই আনন্দপ্রাপ্তি ভিন্ন কবিতার আস্বাদন ঘটে না। অল্প বয়সে ওটা ঘটে যায়। আচম্বিতে ঘটে। সে যেন জলের মত ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়..
কলেজ স্ট্রিটের রাস্তায় হাঁটতে শামসুর রাহমান আমাকে বলেছিলেন, তুমি আমি, আমরাই দুনিয়ায় প্রকৃত সংখ্যালঘু।

কবিতার মর্মগ্রহণের সক্ষমতা না থাকলে কবিতা রচনা অসম্ভব। কবিতার মর্মগ্রহণে সাবলীল না হলে কবিতাপাঠও ঠিকঠাক হয়না। ‘শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন’ মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাকে কবি বলে বিবেচনা করেছিলেন। মাইকেলের চতুর্দশপদাবলির ওই কবিতাটি এখানে স্মরণ করি :
কে কবি— কবে কে মোরে? ঘটকালি করি,
শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন,
সেই কি সে যম-দমী? তার শিরোপরি
শোভে কি অক্ষয় শোভা যশের রতন?
সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী
যার মনঃ-কমলেতে পাতেন আসন,
অস্তগামি-ভানু-প্রভা-সদৃশ বিতরি
ভাবের সংসারে তার সুবর্ণ-কিরণ।
আনন্দ, আক্ষেপ ক্রোধ, যার আজ্ঞা মানে
অরণ্যে কুসুম ফোটে যার ইচ্ছা-বলে;
নন্দন-কানন হতে যে সুজন আনে
পারিজাত কুসুমের রম্য পরিমলে;
মরুভূমে— তুষ্ট হয়ে যাহার ধেয়ানে
বহে জলবতী নদী মৃদু কলকলে!
মরুভূমিতে নদী বইয়ে দিতে পারে যে, সে-ই কবি। আপন ক্ষমতাকে সেই স্তরে উন্নীত করেছিলেন শ্রীমধুসূদন।
তাঁরও আগে কবির মনোবাসনা ব্যক্ত করে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র লিখেছিলেন :
বাসনা করয়ে মন পাই কুবেরর ধন
সদা করি বিতরণ তুষি যত বাসনা।
আশনাই আরো চাই ইন্দ্রের ঐশ্বর্য পাই
ক্ষুধামাত্র সুধা খাই যমে করি ফাঁসনা।।

বিধ্বস্ত প্রাণে ফুর্তির দিগন্ত খুলে দেয় কবিতা। কবিতার বই পড়লে, কবিতাপাঠে জব্দগণতন্ত্রের দেশে মনে হয়, আমি কত স্বাধীন।
রোগের সঙ্গে সারাজীবন হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় কুস্তি লড়ে তাই তো শেষ জীবনেও বিনয় মজুমদার লিখতে পেরেছিলেন :
এখন বকুল ফুল কী জানি কী করে ভুল
হয়ে গেছে জবা
দেখে এ অদ্ভুত রঙ্গ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ
একযোগে আমাকেই দিয়েছে বাহবা।
এই কবিতার স্তবকটি বুঝিয়ে দেয় ব্যাধিদীর্ণ কবিকে কখনও ছেড়ে যায়নি আনন্দ।
মনে মনে আমি তাঁদের দেখা পাই।

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারি ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
অত্যন্ত সুন্দর ভাবে কবিতা কি, কেন, কাদের জন্যে, কারা পড়ে, কারা লেখে, এই সব কথা ভীষণ ভীষণ ভালো লাগলো। সাথে মধুসূদনের লেখা পড়ে খুব আনন্দ পেলাম!
তোমার মত কবি ই পারে এত ভালো বিশ্লেষণ করতে! অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নিও।