
সুনীতিকুমার পাঠক – এক আত্মশরণাগত প্রাণ
মে মাস। বোলপুর। সকাল এগারোটা। আগুন ঢালছে সূর্য সদ্য হওয়া উন্নয়নের ঢালাই রাস্তায়। জয়দীপ রুদ্রের বাইক অবনপল্লীর একটি বাড়ির গ্রীলের গেটের সামনে নামালো আমাকে। শান্তিনিকেতনের অন্যান্য বাড়ির মতো অত বেশি বেশি দেখনদারি না থাকলেও সেই ঘাসমাখা জমি ও একটু বাগানের আভাস ডিঙিয়ে ঢুকতেই মনে হলো-এই তো সেই ছোটবেলার লাল রোয়াক। হলুদ বাড়ি। খয়েরী জানালা-দরজা। জয়দীপ বলল, জানালায় উঁকি মেরে দেখুন, দেখুন কী করছেন!
কৌতূহলে উঁকি দিলাম। একটি চৌকি। ফুলতোলা সাধারণ চাদর। এক রোগা বৃদ্ধ বুকে বালিশ চেপে উপুড় হয়ে শুয়ে। ধপধপে নয়, আবার খুব অপরিস্কার নয় এমন ধূতি লুঙ্গির মতো করে পরা। গায়ে আলগোছে সাদা পাঞ্জাবী। বালিশের সামনে চার/পাঁচটা মোটা মোটা বই খোলা। বেশ কিছু লাইন-টানা ফুলস্কেপ কাগজ। তার উপরে একটি শীর্ণ ফরসা আঙুল নড়াচড়া করছে। তিনি লিখে চলেছেন। লাল রোয়াকের দু’ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে খয়েরী দরজা দিয়ে ঢুকে ডানদিকের ঘড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তিনি লিখছেন। তাঁর মাথার সোজাসুজি দেওয়ালের কোণে লাল সিমেন্টের মেঝের একটু উপরে বুদ্ধ মূর্তি। জয়দীপ ডাকতে যাচ্ছিল ওনাক। ইশারায় থামালাম। তিনি লিখছেন। অবিন্যস্ত সাদা এলোমেলো চুল। হঠাৎ নড়ে উঠলেন। চমকে, ‘আসুন, আসুন আসুন।’ উঠে বসলেন দ্রুত। কোনো আড়ষ্টতা নেই। চোখে মুখে ৯৬ বছরের কোনও ক্লান্তি নেই।

‘চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসুন। ফ্যানের সুইচটা অন করে দিয়ে বসুন।’ উজ্জ্বল চোখে খুশির ঝিলিক। গপ্পো করার আদুরে ডাক।
‘না না ঠিক আছে, আপনার শরীর ভালো আছে তো! ফ্যান চালাননি। আমার ফ্যান লাগবে না। ঠিক আছে…।’ আমতা আমতা করলাম ঘর্মাক্ত আমি।
‘আমার শরীর ঠিক আছে।’
‘ফ্যান চালাননি এই গরমে তাই ভাবলাম…’।
‘না না। ফ্যান চালাই না। আসলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যতোটা সম্ভব কম যাই। এই গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতের ভেতর দিয়ে প্রকৃতি আমাদের অ্যাক্লামাটাইস করতে করতে নিয়ে যায়। আমরা টেনে হিঁচড়ে বিরুদ্ধাচারণ করি। ফলে আমরাই ফাঁপড়ে পড়ি।’
‘তাই বলে তো আর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আধুনিক বিজ্ঞানকে…।’
থামিয়ে দিলেন। তাকিয়ে থাকলেন অদ্ভুত কৌতুকে। তারপর শুরু করলেন আধুনিকতা কাকে বলে দিয়ে, চলে গেলেন গীতার শ্লোকে। কন্ঠস্থ পরিস্কার উচ্চারণে বলছেন। সেই সময় চা নিয়ে ঢুকলেন সহধর্মিনী। হাতে ট্রে। মুখে গীতার শ্লোক। উঠে চায়ের আমি ধরি। তিনি এক গাল হেসে বলেন, ‘আবার ভুল উচ্চারণে গীতার শ্লোক বলে!’
বৃদ্ধের সরল হাসি, ‘দিলে তো আমার প্রেস্টিজ পাংচার করে!’
‘উচ্চারণটা ঠিক করে করো!’ ঢালা লাল পাড় তাঁতের শাড়ি মস্করায় দুলে ওঠে।
প্রণাম করি দু’জনে। ‘থাক, থাক, দুপুরে দু’টি খেয়ে যেও। উনি যা খাবেন তাই খেয়ে যেও।’
‘ওনার তো না না রেস্ট্রিকশন, আর বেলাও হয়ে গেছে…।’ আমতা আমতা করি।
‘কিসের রেস্ট্রিকশন! উনি সব খান। জিগ্যেস করো ওনাকে।’ লাল পাড় ঘোমটা সরে যাদুকরি গল্পের ঝাঁপ খুলে যায়।
ততক্ষণে গ্রীষ্মের দুপুর বারোটায় এক ৯৬ বছরের বৃদ্ধ চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে মৌজ নিয়ে বলছেন, ‘আমি সব খাই। চায়ে চিনিও খাই। শাক, সবজি, মাছ, মাংস সব। তবে অল্প অল্প।’
আমি উল্লসিত, ‘গোপন রহস্যটা বলুন।’
‘শরীর যখন যা চায় তার বার্তা পাঠায় মনে। মন যা চাইবে তাই খাবে। Listen to yourself , নিজের কথা শুনতে হবে। তাঁর জন্য নিজের ভেতরে ডুব দিতে হবে। আত্মস্থ। সময় দিতে হবে। শান্ত করতে হবে। আত্মশরণ ভব। আত্মশরণাগত হওয়া।’ বলে চলেছেন তিনি। সেখান থেকে ‘আত্ম’ কী! চলে গেলেন লক্ষণ সম্পর্কে, তথাগতের লক্ষণগুলো কি কি। অনায়াসে চলে গেলেন ক্রিমিনোলজি নিয়ে বলতে বলতে ৬৪,১৬ সংখ্যার ব্যাখ্যা। অবাক শুধু মুর্খের মতো একটি একটি প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছি। উনি শিশুর চাপল্যে মস্করা, মজা করতে করতে চলে যাচ্ছেন বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে।
দেবতার কাছে মানুষ যায় ক্ষুদ্র হতে। অহং এর ভার নামিয়ে রাখতে। গিয়েছিলাম ফিরে আসব বলে।
সুনীতিকুমার পাঠক। আশ্চর্য মায়াভরা মৃদু আলোময় ঘরে বসে আছেন চৌকির উপর। চৌকিতে ছড়িয়ে আছে
ডেস্ক্রিপ্টিভ ক্যাটালগ অফ ইন্ডিজেনাস টিবেটান ম্যানুস্ক্রিপ্টস। নীতিশাস্ত্র। তন্ত্রচর্চা। নালন্দা, তক্ষশীলা, অশ্বঘোষ। অজস্র বই। তিনি পড়ে চলেছেন।

তিনি হেঁটে চলেছেন হিমালয়ের অন্দরে অন্তরে। হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিব্বতের গ্রামে গ্রামে। খুঁজে ফিরেছেন বৌদ্ধ পুঁথি। সংগ্রহ করেছেন। এক পরিব্রাজক ফিরে এসেছেন ঘরে। ঘুরে বেড়িয়েছেন ইংল্যান্ড, আমেরিকা। তাঁর বক্তৃতা মালা ছড়িয়ে আছে অযুত নিযুত ছাত্রদের বুকের গভীরে।
১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্বভারতীতে যোগ দেন সুনীতিকুমার ২০৫ টাকা মাইনের পুঁথি বিভাগে চাকরি নিয়ে। অধ্যাপক সি আর লামার সঙ্গে যৌথভাবে গড়ে তোলেন ইন্দো-টিবেটান স্টাডিজ। ভারত-তিব্বতি চর্চার শুরু। তিনি সেই সময় চিনা ভবনে ছাত্র হিসেবেও যোগ দিয়ে শেখেন চিনা ভাষা। পালি, প্রাকৃত, মঙ্গোলিয়ান, তিব্বতী, চিনা ভাষা তাঁর আয়ত্তে আসে। বৌদ্ধতন্ত্র এবং বৌদ্ধশাস্ত্র তাঁর গবেষণার বিষয়। ১৯৬১ সালে ভারত সরকারের নির্দেশে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। চলে যান লাদাখ সীমান্তে ও তিব্বতের প্রান্ত থেকে প্রান্তে। চিন ও তিব্বতি ভাষায় বলা বিভিন্ন খবরাখবর ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে অনুবাদ করে সাহায্য করতেন। আর অন্দরে কন্দরে ঘুরে বেড়িয়ে খুঁজে ফিরতেন বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন পুঁথির হদিস। ১৯৬৯ সালে ফিরে আসেন আবার বিশ্বভারতীতে। ২০০ এর উপর তাঁর গবেষণা পত্রের সংখ্যা। অসংখ্য বই ইংরেজি ও বাংলায়। বিশ্বভারতীতে তাঁকে বলা হতো লিভিং এনসাইক্লোপিডিয়া। যে কোনো প্রশ্নের তাৎক্ষণিক নির্ভুল উত্তর দিতেন – এমন কথা অধ্যাপকেরাই বলেন।
শেষ সময়ে তাঁর পাশে থাকা সন্তানসম (সুনীতিকুমারকে বাবা বলেই ডাকতে শুনেছি) জয়দীপ রুদ্র বলছিল, ‘ওনার একটিই আফশোস থেকে গেল, ‘কালযন্ত্র তন্ত্র’ নিয়ে লিখছিলেন শেষ করতে পারলেন না।’ ডানদিকের ক্ষমতা চলে গেছিল। লিখতে পারতেন না। শেষ দিন অবধি তাঁর মাথা সচল ছিল। জ্ঞান তাপস এই সময়ে খুব খুব বিরলতম ব্যাক্তিত্ব। চলে গেলেন অনাড়ম্বর, যেমন তিনি যাপনে পছন্দ করতেন।
কখনও সখনও ঈশ্বর আসেন মানুষের কাছে। আমরা গুরুত্ব দিই না।

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারি ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]